শংকর দে
সম্পাদক
Newstews বাংলাক্রম Live
আট জুন, সোমবার শিলচরের গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু প্রতীক্ষিত ‘এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল মিটিং।’ এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপাচার্য নিরঞ্জন রায় কি পার পেয়ে যাবেন ? ‘এক্সিটিউটিভ কাউন্সিল ‘ পদাধিকারী, সদস্যরা কি নিরঞ্জন রায়ের মর্জিমাফিক ,বিধি বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে অনুমোদন দেবেন ? এ অঞ্চলের দুই খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ সজলেন্দু দাস লস্কর এবং চন্দন দে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল ‘সদস্য।এই দুই স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব নীতির প্রশ্নে কোনও অবস্থায় আপস করবেন না বলে মনে করা হচ্ছে ।এ ছাড়াও ‘এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল’-এ রয়েছেন রাজ্যের উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর পমি বরুয়া।পমি বরুয়া অত্যন্ত দক্ষ আধিকারিক হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর ভূমিকা কী হবে ,সে দিকেও তাকিয়ে রয়েছেন শৈক্ষিক মহল।
শিলচরের গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি পাঠ্যক্রম চালু করার ক্ষেত্রে গুরুতর অভিযোগের কথা উঠে এলো।নিয়ম ,নীতি বহির্ভূতভাবে ঢালাও পিএইচডি প্রদানের যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে ; সেটা নিয়ে শৈক্ষিক মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমূহ অভিযোগের তীর তাক করে আছে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিরঞ্জন রায়ের দিকে। দেখা যাচ্ছে , স্নাতকোত্তর স্তরে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে পঠনপাঠন; সব কিছু নিয়েই এখনও গভীর প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে। অথচ ,এই দিশাহীন পরিস্থিতিতেও পিএইচডি নিয়ে কার্যত চরম হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উপাচার্য নিরঞ্জন রায়।কেউ কেউ এমনও মন্তব্য করেছেন যে, পিএইচডি -র এক বড়সড় বাজার যেন বসানো হচ্ছে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেড়শো জন আবেদনকারীর মধ্যে থেকে ছিয়ানব্বই জনকে ভর্তি করা হয়েছে
গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে, শেষ
পর্যন্ত তাঁদের ভবিষ্যৎ গিয়ে কোথায় দাঁড়াবে , সেটাই গভীর আশংকার বিষয়। কারণ, পিএইচডি-তে যাঁদের ভর্তি করা হয়েছে ; তাঁদের অনুষদ অর্থাৎ গাইডেন্স, শিক্ষকবৃন্দ কোথায়? দেখা যাচ্ছে , গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত শুধু উপাচার্য পদেই নিযুক্তি প্রদান করা হয়েছে ।এ ছাড়া , আর কোনও শিক্ষক পদে এখন অবধি কোনও নিযুক্তি হয়নি। যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা সকলেই কলেজ স্তরের শিক্ষক। এই কলেজ শিক্ষকদের মধ্যে আবার অনেকেরয়েছেন, যাঁরা নেহাতই চুক্তিভিত্তিক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন।এই ধরনের শিক্ষকরা কলেজে যাতে কোনও অবস্থায় শিক্ষকতা করতে না পারেন,এ সংক্রান্ত কড়া নির্দেশ দিয়েছেন অসমে উচ্চ শিক্ষা দফতরের আয়ুক্ত ও সচিব নারায়ণ কোঁয়র।
দেখা যাচ্ছে , স্নাতক স্তরেই যাঁরা পড়ানোর অধিকারী নন, তাঁদের উপর পিএইচডি প্রদানের কর্তৃত্ব ন্যস্ত হয়েছে।রাজ্যের সকল প্রাদেশিকৃত মহাবিদ্যালয় ও সরকারি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষদের কাছে গত সতেরো এপ্রিল উচ্চ শিক্ষা বিভাগের আয়ুক্ত ও সচিব নারায়ণ কোঁয়র প্রদত্ত এক নির্দেশিকায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ,
অনুমোদিত পদ ব্যতীত শিক্ষক ও অশিক্ষক পদে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছ।বলা হয়েছে ,বর্তমানে যদি কোনও
চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োজিত থাকেন, তবে প্রযোজ্য নিয়ম ও চুক্তির শর্ত মোতাবেক যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেই নিয়োগ বাতিল করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।আরও জানানো হয়েছে যে ,পরবর্তীতে কোনও অনিয়ম ধরা পড়লে বিনা নোটিশে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।অবস্থা যখন এই পর্যায়ে, তখন সম্পূর্ণ উল্টো পথে চলছেন গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিরঞ্জন রায়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ করা যেখানে তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি ,সেখানে পিএইচডি নিয়ে কার্যত ছেলেখেলা করতে চাইছেন তিনি। গুরুচরণ -এ স্নাতক স্তরে মাস কমিউনিকেশন, বায়ো-টেকনোলজি ,এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স , কম্পিউটার সায়েন্স, বিজনেস অ্যাডমিনিসট্রেশন বিভাগ সরকার স্বীকৃত নয় এখনও।এ সব বিভাগে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকতা যাঁরা করছেন,
বিভাগীয় সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী স্বপদে আর তাঁদের বহাল থাকার কথা নয়।পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে , উপাচার্য নিরঞ্জন রায়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে ওই শিক্ষক-শিক্ষিকারা পিএইচডি ‘ রিসার্চ গাইড ‘হয়ে গিয়েছেন। অথচ, পরিহাস এটাই যে; স্নাতক স্তরেই তাঁদের চাকরির কোনও নিশ্চয়তা নেই ।এই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মাসিক বেতন পনেরো হাজার টাকারও কম।
পিএইচডি গাইড হতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী পদে কর্মরত অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক হওয়া বাধ্যতামূলক। সহকারী অধ্যাপকরাও গাইড হতে পারেন, তবে তাঁদের নির্দিষ্ট গবেষণা অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।পিএইচডি ডিগ্রি থাকা অপরিহার্য।ইউজিসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীর খ্যাতনামা ও পিআর-রিভিউ জার্নালে ন্যূনতম প্রকাশিত গবেষণাপত্র থাকতে হবে ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী মাস্টার্স বা সমমানের ক্লাসে পড়ানোর দীর্ঘ অ্যাকাডেমিক অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা পরিচালনার সক্ষমতা থাকতে হয়।
তা’হলে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনাপ্রবাহ কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো? অভিযোগ উঠেছে , আর্থিক লেনদেন এ ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠেছে। পিএইচডি -তে ভর্তির ক্ষেত্রে মাসুল হিসেবে বিজ্ঞান বিভাগে প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে পঁচিশ হাজার দুশো টাকা।কলা ও বাণিজ্য বিভাগে আঠারো হাজার নয়শো টাকা।প্রতি সেমিস্টারে বিজ্ঞান বিভাগে একুশ হাজার টাকা , কলা এবং বাণিজ্য বিভাগে পনেরো হাজার টাকা করে।থিসিস এভ্যুলেশন ফি পনেরো হাজার টাকা।ভাইবা ভসি ফি সতেরো হাজার টাকা।সব মিলিয়ে ছিয়ানব্বই জনের কাছ থেকে প্রাপ্তির এই অংক কোথায় পৌঁছচ্ছে , সেটা সহজেই অনুমেয়।
গুরুচরণ কলেজ থেকে গুরুচরণ ইউনিভার্সিটি ; একই সঙ্গে ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে জেবি কলেজ যোরহাট, হয়েছে জেবি ইউনিভার্সিটি।কোকরাঝাড় কলেজ হয়েছে কোকরাঝাড় ইউনিভার্সিটি।নর্থ লখিমপুর কলেজ হয়েছে নর্থ লখিমপুর ইউনিভার্সিটি।নগাঁও কলেজ হয়েছে নগাঁও ইউনিভার্সিটি ।বঙ্গাইগাঁও কলেজ হয়েছে বঙ্গাইগাঁও ইউনিভার্সিটি।কিন্তু কোনওটিতেই ‘এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল মিটিং’ না করে পিএইচডি ভর্তির পাঠ্যক্রম শুরু হয়নি।এখানেই ব্যতিক্রম গুরুচরণ ইউনিভার্সিটি।হ্যাঁ,ব্যতিক্রম রয়েছে আরও নানা ক্ষেত্রে। একানব্বই বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গুরুচরণ কলেজ এই ক’দিন হলো উন্নীত হয়েছে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে।অনেকের ‘ আলমা ম্যাটার’ এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বহু স্বপ্ন রয়েছে।কিন্তু তা ‘গুড়ে বালি ‘ করে দিচ্ছেন উপাচার্য নিরঞ্জন রায়।এত তাড়াহুড়ো করে পসরা সাজিয়ে পিএইচডি চালু করতে গেলেন কেন উপাচার্য অধ্যাপক রায়, সেটাই রহস্যাবৃত।একই সঙ্গে চালু হওয়া রাজ্যের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে খবর নিয়ে দেখা গিয়েছে, কোনওটিতেই গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পিএইচডি ভর্তিতে এত তাড়াহুড়ো করা হয়নি।
অন্য দিকে, দেখা যাচ্ছে; নগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব ক’টি বিভাগেই স্নাতকোত্তর ক্লাস শুরু হয়েছে ২০১৮ কিংবা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে।ফলে,সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাত-আট বছর ধরে মাস্টার্স ডিগ্রি পড়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে।তাই,সেখানে কর্মরত স্থায়ী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পিএইচডি গাইডেন্স দেওয়াটা নিশ্চয়ই যুক্তিসঙ্গত।নর্থ লখিমপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু আগে থেকেই স্নাতকোত্তর ক্লাস চলে আসছে, তাই সেখানকার শিক্ষক -শিক্ষিকাদের পিএইচডি গাইডেন্স দেওয়াটা একই ভাবে যুক্তিসঙ্গত। তবে, এই নর্থ লখিমপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সমস্ত বিভাগ ‘স্যাংশনড’ নয় বা ‘স্যাংশনড পোস্ট’-এ শিক্ষক নেই, সেই সব বিভাগে যেহেতু স্নাতকোত্তর ক্লাস শুরু হয়নি ; অতএব, ওই সব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পিএইচডি গাইডেন্স দেওয়া হয় না।একই পরিস্থিতি শিবসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিবসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল মিটিং ‘-এর পর পিএইচডি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।
যে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই দশক অধ্যাপক নিরঞ্জন রায় চাকরি করেছেন, সেখানেও কোনও বিভাগে স্নাতকোত্তর ক্লাস না থাকলে, ওই বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পিএইচডি গাইডেন্স দেওয়া হয় না। নিরঞ্জন রায় সম্যকভাবে অবহিত যে,কেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকারা এত দিন পিএইচডি গাইডেন্স পাননি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স-এ এম ফার্মা শুরু হয়েছে, তাই ধীরে ধীরে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকারা পিএইচডি গাইডেন্স পেতে শুরু করেছেন।
গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুতর বিষয় হলো, ন্যূনতম এক জন স্থায়ী শিক্ষক না থাকা সত্ত্বেও মাস কমিউনিকেশন বিভাগে চার জন, বায়োটেকনোলজি বিভাগে পাঁচ জন , কম্পিউটার সায়েন্স-এ চার জন , এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগে এক জন, বিজনেস অ্যাডমিনিসট্রেশন বিভাগে চার জন গবেষক-গবেষিকার জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।এখন কথা হচ্ছে, এই তেরো-চোদ্দো হাজার টাকা মাইনে পাওয়া পিএইচডি গাইড-রা যদি অন্যত্র চাকরি পেয়ে যান, তা’হলে তাঁরা তো চলে যাবেন।সে ক্ষেত্রে গবেষক-গবেষিকাদের ভবিষ্যৎ কী হবে?
দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সুবাদে নিরঞ্জন রায় এটা নিশ্চিতভাবেই জানেন , যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল-এ চূড়ান্ত হয়। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্ৰহণকারী নয়। কেউ কেউ ‘অটনোমাস’-এর বিষয় উত্থাপন করে উপাচার্য নিরঞ্জন রায়ের অপকর্মকে আড়াল করতে চাইছেন। তাঁদের জেনে রাখা উচিত ,’অটনোমাস’-এর নামে যাচ্ছেতাই কাণ্ড করা যায় না।সরকারি, বেসরকারি যে স্তরের বিশ্ববিদ্যালয় হোক না কেন ; নির্দিষ্ট অ্যাক্ট এবং ইউজিসি নর্মস নির্দেশিকা মেনেই সবাইকে চলতে হয়।
এই সূত্র ধরে কোনও কারণে যদি গবেষক-গবেষিকাদের কাজ বাতিল হয়ে যায়, এর দায়ভার কি উপাচার্য নিরঞ্জন রায় নেবেন? এটা আজকের দিনে মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালীন নিরঞ্জন রায়ের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠে। রয়েছে এ সংক্রান্ত বহু তথ্য। গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ভর্তিতে এক ই ধারা বজায় রাখলেন উপাচার্য নিরঞ্জন রায়।
এ বার দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয় ?
