দলবদল সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না দীনেশপ্রসাদ – তনয়ের , অভিমত অনেকেরই; রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ‘নিউজটিউজ বাংলাক্রম লাইভ’ ‌সম্পাদক শংকর দে ।

ক্ষমতা হারানোর যন্ত্রণায় দগ্ধ প্রাক্তন বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা। সাড়ে চার বছর ধরে মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে সব কিছ।কিন্তু, ছাব্বিশের নির্বাচনের প্রাকপর্বে লক্ষ্মীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের দিকে রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি এখন বিশেষভাবে নিবদ্ধ।প্রাক্তন বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, আলোচনার এটা এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। লক্ষ্মীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন সাতবারের বিধায়ক দীনেশপ্রসাদ গোয়ালা। পিতার প্রয়াণের পর তাঁর পুত্র রাজদীপ গোয়ালা ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে উপ-নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। এর পর ২০১৬-য়ের নির্বাচনেও তিনি বিধায়ক হন। সেই হিসেবে এক নাগাড়ে আট বার , প্রায় চল্লিশ বছর লক্ষ্মীপুর আসন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তথা পয়লাপুলের গোয়ালা পরিবারের দখলে ছিল ।যদিও ১৯৮৩-য়ের বিধানসভা নির্বাচনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দীনেশপ্রসাদ গোয়ালার জয়যাত্রা সূচিত হয়েছিল। কিন্তু একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের প্রারম্ভেই লক্ষ্মীপুর বিধানসভা কেন্দ্র গোয়ালা পরিবারের হাত থেকে ছিটকে গেল।এমনটা যে হতে পারে ,রাজদীপ গোয়ালা ঘুণাক্ষরে টের পাননি। কিন্তু, ২০২১ – য়ে গোয়ালা পরিবারের ‘সাজানো বাগান’ তছনছ হয়ে যায়।পাঁচটি বছর ধরে ক্ষমতা হারানোর ব্যথা রাজদীপ গোয়ালাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।‌ এই করুণ পরিণতির পর ছাব্বিশ – এর বিধানসভা নির্বাচনে রাজদীপ গোয়ালার ‘ভবিতব্য’ কী, তা  স্পষ্ট নয় এখনও। আর এই সূত্র ধরেই বড় প্রশ্ন হলো, লক্ষ্মীপুর  বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী কৌশিক রায় ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি? এটা বেশ চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই পাঁচ বছরে লক্ষীপুরকে ‘সাজিয়ে’ দেওয়ার পর এ বার বড়খলা কেন্দ্রে প্রার্থী হচ্ছেন কৌশিক রায়, বলছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ। কিন্তু, এটা নেহাতই অনুমান নির্ভর কথাবার্তা। আর এই সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে; বিধানসভা, লোকসভা কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের ভিত্তিতে। বড়খলা বিধানসভা কেন্দ্রে এখন এমন জনবিন্যাস যে, কৌশিক রায়ের পক্ষে লক্ষ্মীপুরের চেয়েও অবলীলাক্রমে জয়লাভ করা সম্ভব ,তাঁর কাছের অনেকেই এমনটা মনে করছেন। তবে, কৌশিক রায় নিজে কী চাইছেন, সেটা প্রকাশ্যে আসেনি এখনও।

খুবই সন্তর্পণে ,একেবারে ‘দাবার ঘুঁটি’ ‌সাজিয়ে ,নীল নকশা তৈরি করে রাজদীপ গোয়ালাকে স্বভূমি থেকে উৎখাত করা হয়েছিল।‌ ২০২০-য়ের ডিসেম্বরে রাজদীপ গোয়ালা যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে। এর আগে দল বিরোধী কার্যকলাপের দায়ে অক্টোবরে তাঁকে কংগ্রেস থেকে ছয় বছরের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছিল। কৌশিক রায় কিন্তু এর আগেই শক্তপোক্ত ভিত গড়ে তুলেছিলেন লক্ষ্মীপুরের মাটিতে। কিন্তু রাজদীপ গোয়ালাই বিজেপি মনোনয়ন পাচ্ছেন ,তাঁর ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য ছিল তখন।তাঁদের তরফে এই যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, রাজদীপ গোয়ালার শ্বশুরমশাই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তাঁর আগ্রহে রাজদীপ গোয়ালা বিজেপিতে যোগ দেন।আর এই সুবাদে বিজেপিতে তাঁর মনোনয়ন একেবারে পাকা। দলের একেবারে শীর্ষস্তরে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্য যে বাস্তবতা বিসর্জিত, একুশের দলীয় মনোনয়ন প্রদানকালে সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কৌশিক রায় লক্ষ্মীপুর থেকে শুধু যে বিধায়ক হলেন , তাই নয়; মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি রাজ্য-রাজনীতিতে এখন প্রতিষ্ঠিত। কৌশিক রায় নিজে লক্ষ্মীপুর থেকে সরতে না চাইলে রাজদীপ গোয়ালা কি পারবেন হৃত রাজনৈতিক জমি পুনরুদ্ধার করতে ? এই মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা ‌ছাড়া এর জবাব আর কেউ দিতে পারবেন না, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আর ইতিমধ্যে হিমন্তবিশ্ব শর্মা কথা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, নির্বাচনে মনোনয়নের ‌একেবারে শেষ লগ্নেও বিজেপি প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হতে পারে।‌ অর্থাৎ, প্রার্থিত্ব নিয়ে টানটান প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে অন্তিম মুহূর্ত অবধি। আর এই প্রেক্ষাপটে রাজদীপ গোয়ালাকে যদি মুখ্যমন্ত্রী তথা দলীয় তরফে লক্ষ্মীপুর কেন্দ্র নিয়ে আগেভাগে ‘‌সবুজ সংকেত’ না দেওয়া হয়, তা’হলে স্বীয় রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন? এ ক্ষেত্রে তাঁর কাছে কী কী বিকল্প রয়েছে ?

ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছেন রাজদীপ গোয়ালা। এ ক্ষেত্রে কী কী সম্ভাবনা রয়েছে, একটু বিশ্লেষণ করা যাক। প্রথমত, সামগ্রিকভাবে খোঁজখবর নিয়ে তিনি যদি উপলব্ধি করেন যে, কোনও কেন্দ্রেই বিজেপি তাঁকে মনোনয়ন দেবে না, তা’হলে ‌শরণাপন্ন হতে হবে সেই কংগ্রেসেরই। কংগ্রেসে মনোনয়ন পেতে হলে অবশ্য তাঁকে কিছুটা হলেও কাঠখড় পোড়াতে হবে। কারণ, ২০০০-য়ের ৯ অক্টোবর দলবিরোধী কার্যকলাপের জন্য কংগ্রেস থেকে তাঁকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয় এবং তিনিও ডিসেম্বরে ছেড়ে দিয়েছিলেন বিধায়ক পদ। তবে তাঁর পক্ষে আশার কথা যে, বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো লক্ষ্মীপুরে তেমন কোনও কংগ্রেস মনোনয়ন প্রত্যাশী এখনও ময়দানে নেই। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের এই যে মাস কয়েক রয়েছে; নিজস্ব সাংগঠনিক ‌‌‌ভিত গড়ে তুলে নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা।এতে জয় পেয়ে গেলে তিনি কিন্তু নিজেকে সগৌরবে প্রমাণ করতে পারবেন।তবে, এর জন্য তাঁকে তাঁর পিতা দীনেশপ্রসাদ গোয়ালার মতো ‘রাজনৈতিক শক্তি’ অর্জন করতে ‌হবে।এটা সম্ভব কি না, তিনিই তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন। তৃতীয়ত, যা হওয়ার হবে, এই দৃষ্টিভঙ্গি।সব কিছু ‘ভাগ্যের’ উপর ছেড়ে দেওয়া।এ ছাড়াও, যে বিষয়গুলো ‌উঠে আসছে, তা হলো; লক্ষ্মীপুরের পরিবর্তে বিজেপি যদি রাজদীপ গোয়ালাকে উধারবন্দ বা বড়খলা বিধানসভা কেন্দ্রে মনোনয়ন দিতে চায়, তা’হলে তিনি তা গ্রহণ ‌করবেন কি না? রাজদীপ গোয়ালার কাছে এটা নিশ্চিতভাবেই একটা গভীর প্রত্যাহ্বান যে, লক্ষ্মীপুরের বিচরণ ক্ষেত্র ছেড়ে তাঁকে ‘পরবাসী’ আশ্রয়ে ফের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পেতে হবে। এই সূত্র তিনি মেনে নেবেন কি, স্পষ্ট নয় এটাও।

এ দিকে, এটাও তাৎপর্যপূর্ণ যে; ২০২৪-য়ের অক্টোবরে ‘অসম টি কর্পোরেশন লিমিটেড’ – ‌‌এর চেয়ারপার্সন পদ থেকে পদত্যাগ করেন রাজদীপ গোয়ালা। বিধানসভার আসন থেকে তাঁকে দলীয় তরফে অপসারিত করার পর ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন’ হিসেবে ‌২০২১-‌যে়র নভেম্বরে তাঁকে সরকারি এই পদে নিযুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী কাছাড় চা শ্রমিক ইউনিয়ন – এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এখন তিনি বিভিন্ন স্থানে যে সভা-সমিতি করছেন; তাতে ‌‌কিন্তু ‌বিজেপি,কংগ্রেস সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা যুক্ত থাকেন ।অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দলকে আপাতত সরিয়ে রেখে ব্যাপক জনসংযোগের মধ্যে দিয়ে, প্রকারান্তরে বিধানসভা নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রচারপর্ব এ ভাবেই শুরু করে দিয়েছেন রাজদীপ গোয়ালা।

রাজদীপ গোয়ালার বর্তমান ‌পরিণতির নেপথ্য কারণ হিসেবে রাজনৈতিক মহলে বিভিন্ন দিক চর্চিত হয়।‌ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর পিতা দীনেশপ্রসাদ গোয়ালার সঙ্গে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা আগেকার মন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার সম্পর্কের টানাপোড়েন। ২০০১-য়ে প্রথম বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর রাজ্যের তরুণ গগৈ সরকারে মন্ত্রী হন হিমন্তবিশ্ব শর্মা।মন্ত্রী হিসেবে শুরু থেকেই তিনি প্রভাবশালী হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হন।তখন এক নাগাড়ে পাঁচ বারের বিধায়ক তথা মন্ত্রী দীনেশপ্রসাদ গোয়ালাও ছিলেন যথেষ্ট ক্ষমতাবান । এর আগেও ১৯৯১-য়ে হিতেশ্বর সরকারে তৃতীয় বারের বিধায়ক হিসাবে দীনেশপ্রসাদ গোয়ালা গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। হিমন্তবিশ্ব শর্মা তখন যুবা ব্যক্তিত্ব হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়ার বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পটভূমিতে দীনেশপ্রসাদ গোয়ালার সঙ্গে  হিমন্তবিশ্ব শর্মার মতান্তর বা মনান্তর থাকার কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কৌশিক রায় এবং রাজদীপ গোয়ালা দু’জনেই বাণিজ্যে স্নাতক। কৌশিক রায় শিলচরের গুরুচরণ কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ও অরুণকুমার চন্দ কলেজের আইনেও স্নাতক ।রাজদীপ গোয়ালা বাণিজ্যে স্নাতক দিল্লি কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড কমার্স থেকে। এর পর যুক্তরাজ্যের নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির নটিংহাম বিজনেস স্কুল থেকে ইকোনমিক্স ও ফাইনান্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর  ডিপ্লোমা অর্জন করেন।কৌশিক রায়ের বয়স ৪৯ এবং রাজদীপ গোয়ালার ৪২।চল্লিশের কোঠায় থাকা বরাক উপত্যকার এই দুই নেতার মধ্যে রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক ‘সংঘাত ‘আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সে দিকে তাকিয়ে অনেকেই। এখন দু’জন একই দলে থাকায় পারস্পরিক বাদানুবাদের অবকাশ নেই। যদিও কৌশিক রায় প্রায়শই লক্ষ্মীপুরে কংগ্রেস শাসনের কঠোর সমালোচনা করে স্বীয় ‌এই কার্যকালকে ‘যুগান্তকারী’ বলে অভিহিত করে থাকেন।

এই প্রেক্ষাপটে লক্ষ্মীপুরের নির্বাচনী রণাঙ্গনকে ঘিরে রাজনৈতিক আবহ আগামী দিনে যথেষ্ট উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে পারে, এমনটা মনে করা হচ্ছে।

[ প্রতিবেদনের ছবি : দীনেশপ্রসাদ গোয়ালা ও রাজদীপ গোয়ালা । ]

Shankar Dey

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *