শিলচর কেন্দ্রে চক্রাকারে ঘুরছে যেন বিজেপি বিধায়কের আসন! সমরেন্দ্রনাথ সেন, দিলীপকুমার পালের মতো দীপায়ন চক্রবর্তীর প্রস্থান কি আসন্ন? বিশ্লেষণে “নিউজটিউজ বাংলাক্রম লাইভ” সম্পাদক শংকর দে।

শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ সর‌গরম আলোচনা হচ্ছে। চর্চার ‌কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী।ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাবেন কিনা ,‌এটাই ‌বড় ‌প্রশ্ন। এই ‌বি‌‌ষ‌য়‌টিকে আরও উস্কে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ‌‌‌হিমন্তবিশ্ব শর্মা স্বয়ং। কারণ, কিছু দিন আগে শ্রীভূমিতে ‌সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে হিমন্তবিশ্ব শর্মা জানিয়ে দিয়েছেন ,‌‌ এক মাত্র পাথারকান্দিতে কৃষ্ণেন্দু ‌পালের ‌মনোনয়ন নিশ্চিত। অন্যান্য আসনে একেবারে ‌শেষ মুহূর্ত অবধি অপেক্ষা করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যে বরাক উপত্যকার সকল বিধায়কও কার্যত ভীষণ চাপে পড়ে গিয়েছেন। কোনও কোনও দলীয় বিধায়ক-সাংসদদের বাদ দিয়ে মনোনয়ন প্রদানের রীতি যে হিমন্তবিশ্ব শর্মা চালু করেছেন, এমনটা নয়।বিজেপিতে ‌এ‌ই পরম্পরা বহমান। ১৯৯১ থেকে ২০২১; ‌অসমে বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে ‌‌বি‌ধায়ক, সাংসদ থাকা সত্বেও অনেককেই বিজেপি ফের মনোনয়ন দেয়নি। এই আবহে বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তীর রাজনৈতিক ভাগ্য নিয়েও নানা রকম চর্চা চলছে।

দীপায়ন চক্রবর্তীকে সব চেয়ে বেশি বেকায়দায় ফেলে দিতে পারেন প্রাক্তন লোকসভা সদস্য রাজদীপ রায়। এই মুহূর্তে দীপায়ন চক্রবর্তীর কাছে এটাই গভীর চিন্তার বিষয়। অনেকটা  অপ্রত্যাশিতভাবেই গত বিধানসভা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন দীপায়ন চক্রবর্তী। আর তাঁকে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার জন্য যাবতীয় রণকৌশল তৈরি করেছিলেন শিলচরের ওই সময়কার লোকসভার সদস্য রাজদীপ রায়। শিলচরের তৎকালীন বিজেপি বিধায়ক দিলীপকুমার পালকে মনোনয়ন বঞ্চিত করাই ছিল রাজদীপ রায়ের মূল লক্ষ্য। শুধু রাজদীপ রায় নন, কাছাড় থেকে দিশপুর; বিজেপির বিভিন্ন স্তরের বেশ ক’জন ‌গুরুত্বপূর্ণ নেতা দিলীপকুমার পালকে ক্ষমতার বলয় থেকে ছিটকে দিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন । কারণ, ‌দিলীপকুমার পাল তাঁদের কাছে’বেগড়বা‌ই ঘোড়া ‘‌‌হয়ে উঠেছিলেন। বিধানসভা উপাধ্যক্ষের পদ পেয়েও যিনি ছেড়ে দেন, তাঁকে ফের দলীয় মনোনয়ন প্রদানের ঝুঁকি নিতে চাননি দলের একাংশ। এই উৎস পথ ধরেই দীপায়ন চক্রবর্তীকে শিলচরের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ময়দানে নামিয়েছিলেন রাজদীপ রায়। তিনি যে মোক্ষম ‘চাল’দিয়েছিলেন, এর মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি দিলীপকুমার পালের। রাজনৈতিক মহল মনে করেন , দিলীপকুমার পালের এই পরিণতির জন্য দায়ী তাঁর ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।’ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়ালকেই বেশি ভরসা করেছিলেন তিনি।‌ শোনা যায়, চূড়ান্ত তালিকায় শিলচরে দিলীপকুমার পালের নাম নেই দেখে সর্বানন্দ সনোয়াল চমকে উঠেছিলেন। কিন্তু, তখন তাঁর কিছুই করার ছিল না।

এই ক’বছরে দৃশ্যপট অনেক পাল্টে গিয়েছে।যে রাজদীপ রায় এক সময় হিমন্তবিশ্ব শর্মার’নেকনজরে’ছিলেন, এখন আর ততটুকু নেই ।‌‌‌শিলচর লোকসভা কেন্দ্র তফসিলি সংরক্ষিত হয়ে যাওয়ায় সাংসদের ‘রাজ্যপাট’ হারিয়েছেন রাজদীপ। রাজ্যসভা সদস্য হওয়ার যে ক্ষীণ আশা ছিল, সেটাও অন্তর্হিত।বরং কণাদ পুরকায়স্থকে রাজ্যসভা সদস্য করে এখানকার বিজেপি রাজনীতিতে ভাষা বা জাতিভিত্তিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটা বার্তা দেওয়া হয়েছে। এই ‌‌আবহে নির্বাচনী রাজনীতিতে রাজদীপ এখন গভীর শূন্যতার মধ্যে রয়েছেন। দল থেকে তাঁকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।তিনি ত্রিপুরায় শাসক দল বিজেপির ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।’ লক্ষ্মীপুরের প্রাক্তন বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালার মতো একই অবস্থানে রয়েছেন প্রাক্তন সংসদ রাজদীপ রায়।আসন হারিয়ে দু’জনেই বেকায়দায়। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য রাজদীপ রায়ের ‌‌একমাত্র লক্ষ্য হলো ,’যেন-তেন প্রকারেণ’ছাব্বিশে শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রে মনোনয়ন ‌আদায় করা।কার্যত এর কোনও বিকল্প তাঁর কাছে নেই।রাজদীপ রায়ের পিতা বিমলাংশু রায় ছিলেন খ্যাতনামা বিজেপি নেতা,আইনজীবী। তিনিও কিন্তু ১৯৯৬-য়ের নির্বাচনে শিলচর কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক সমরেন্দ্রনাথ সেন – এর পরিবর্তে দলীয় মনোনয়ন লাভ ‌করেছিলেন।সমরেন্দ্রনাথ সেনও ছিলেন সুপরিচিত আইনজীবী। ১৯৯১-এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না বিমলাংশু রায়।রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তিন সন্তানের পড়াশোনার বিষয়টিতেই তিনি তখন অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন ।কিন্তু,১৯৯৬-য়ের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন তিনি।তখন বিজেপি মণ্ডল কমিটি প্রদত্ত নামের তালিকার সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রার্থী মনোনয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো।মণ্ডল থেকে দু-তিন জনের নাম পাঠানো হলে জেলা স্তরে সেটা অপরিবর্তিত থেকে যেত ।রাজ্য কমিটিতে এক জনের নাম চূড়ান্ত করা হলে তাতে সিলমোহর পড়তো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের । আর, মণ্ডল কমিটি থেকে কোনও কারণে শুধু এক জনের নাম পাঠানো হলে তাঁর মনোনয়ন প্রাপ্তি একেবারে নিশ্চিত হয়ে যেত।১৯৯৬-য়ে প্রার্থী বাছাই পর্বে বিমলাংশু রায় গোঁ ধরেছিলেন, শিলচরের মণ্ডল কমিটি থেকে শুধু তা‌ঁর নামই সুপারিশ করতে হবে। বেশ একটা টানাপোড়েনের পর সমরেন্দ্রনাথ সেন , যিনি ওই সময়কার বিধায়ক ছিলেন; সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর নাম বাদ দিয়েই মণ্ডল কমিটি থেকে তালিকা পাঠানো হয়েছিল। অথচ , অত্যন্ত সৎ,নীতিনিষ্ঠ হিসেবে সমরেন্দ্রনাথ সেনের ‌সর্বত্র যেমন খ্যাতি ছিল, তেমনি বিধায়ক হিসেবে  বিধানসভায় দায়িত্ব পালনেও সফল ছিলেন তিনি ।অথচ, কোনও কারণ ছাড়াই দল তাঁকে রাজনৈতিক ‘নির্বাসনে’পাঠিয়ে দিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে ,শিলচরে দলীয় ওই মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় বরেণ্য বিজেপি নেতা কবীন্দ্র পুরকায়স্থও শেষ পর্যন্ত ছাড়পত্র দিয়েছিলেন বিমলাংশু রায়কেই।

বিমলাংশু রায়ের মতো ‌দলীয় স্তরে ‌এখন এত সুবিধাজনক অবস্থানে নেই রাজদীপ রায় । তবে, সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি নেতৃত্বের অনেকের সঙ্গেই রয়েছে তাঁর সুসম্পর্ক। শিলচরে দলীয় মনোনয়ন পেতে এতে কিছুটা হলেও তাঁর সহায়ক হবে । রাজদীপ রায় যুক্তরাজ্যের ডিগ্রিধারী  চিকিৎসক ,’অর্থপেডিক সার্জন। ‘বয়স পঞ্চান্ন। প্রায় ‌একই বয়স দীপায়ন চক্রবর্তীর।এক বার সংসদীয় রাজনীতি করার পর রাজদীপ রায়ের বর্তমান অবস্থান থেকে উত্তরণে আগামী বিধানসভা নির্বাচন যে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তাঁর চেয়ে আর কেউ সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন না।

এখন কথা হলো, সমরেন্দ্রনাথ সেনকে তো কোনও কারণ ছাড়াই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল; দীপায়ন চক্রবর্তীর ক্ষেত্রে কী হবে? বিধায়ক হিসেবে দীপায়ন চক্রবর্তীকে কেন্দ্র করে নেতিবাচক এবং ইতিবাচক দুটো দিকই রয়েছে ।যে কথা বাজারে চাউর হয়েছে, তা হলো ; প্রভূত ‘অর্থাগম’ হয়েছে তাঁর।তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা আবার বলে থাকেন, ব্যাপারটি ঠিক এতটুকু নয়; আসলে ‘গল্পের গরু গাছে চড়ে!’ দীপায়ন ছোটবেলা থেকে রাজনীতি করলেও পেশা হিসেবে ছোটখাটো ঠিকাদারি ,ব্যবসা করার অভ্যাস ছিল ।তিনি বিধায়ক হওয়ার আগেই ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে কেন্দ্রে এবং ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজ্যে বিজেপি শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, বিভিন্ন বিভাগে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে একটু একটু করে ঠিকাদারী শুরু করেন। সন্তোষমোহন দেব ,গৌতম রায় ‌থেকে শুরু করে হাল আমলে আরও যাঁরা ঠিকাদারি পেশায় থেকে রাজনীতি করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েছেন; মূলত, তাঁদের সকলেরই ‘শ্রীবৃদ্ধি’ ঘটেছে । শহর শিলচরে ফুটপাতের কাজের উদ্যোগে দীপায়ন চক্রবর্তী মানুষের মন জয় করতে চাইলেও এ নিয়ে পাশাপাশি কিন্তু তীব্র অসন্তোষ রয়েছে।বলা হচ্ছে, অপরিকল্পিত এ সব কাজের জন্য একটু বর্ষণেই  অভাবনীয় জমা জলের ভোগান্তিতে নাগরিক জীবন নাজেহাল।‌শিলচর পুরসভায় পাঁচ বছর ‌ধরে যে নির্বাচন হলো না , এর জন্য বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তীকে দায়ী করা হয়ে থাকে।‌ অন্য দিকে , জনসংযোগের ক্ষেত্রে ইদানীং কালে কিছুটা নড়েচড়ে বসেছেন দীপায়ন চক্রবর্তী ।‌শিলচরে ২০২২-য়ের প্রলয়ংকরী প্লাবনে বানভাসি মানুষকে ‘জল কিনে ‌তৃষ্ণা মেটানোর’ পরামর্শ দেওয়ার পর দীপায়ন চক্রবর্তী যে ভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন ,সেখান থেকে এখন ভালো অবস্থানে রয়েছেন তিনি।তবে , নয় ‌বছর ‌ধরে ভারতীয় রেডক্রস সমিতি, শিলচর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর ভূমিকায় জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজমান। পাশাপাশি, শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থায় স্বীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায়  ‘খেয়োখেয়ি’চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এ সব আরও নানা কারণে দীপায়ন চক্রবর্তীকে ফের মনোনয়ন প্রদান করা হবে না , এমনটা ‌ভাবার কোনও কারণ নেই। কারণ, নানা অভিযোগে বিদ্ধ দলের আরও অনেকেই ।আর ভালো কাজ করেও যে আবার মনোনয়ন পাওয়া যায় না, এ রকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। মনোনয়ন না দিতে হলে শীর্ষ নেতৃত্বের অজুহাতের অভাব নেই , অতীতে এমনটা দেখা গিয়েছে।আসল কথা হলো ,দীপায়ন চক্রবর্তী মনোনয়ন না পেলে রাজদীপ রায়কেই যে তা দেওয়া হবে , এর নিশ্চয়তা কোথায় ? শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রে মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে । অনেকেই ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন জোরকদমে।

‘বেগড়বাই ঘোড়া ‘ দিলীপকুমার ‌পাল‌ও ‘উচিত শিক্ষা ‘পেয়ে বাগে এসে গিয়েছেন।বিধায়ক থাকাকালীন প্রকাশ্যে নিজ দলের অনেকের বিরুদ্ধে তিনি ‘সিন্ডিকেট’চালিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ এনেছিলেন। এই ঘটনাপ্রবাহ এখন অতীত। তিনিও এ বার দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। ময়দানে রয়েছেন আরও ‘ হেভিওয়েট’ প্রত্যাশীরা। এ নিয়ে প্রতিবেদন বারান্তরে।

[প্রতিবেদনের ছবি : প্রাক্তন সংসদ রাজদীপ রায় ও বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী। ছবি সৌজন্য: ফেসবুক।]

Shankar Dey

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *