এত কাঠখড় পুড়িয়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধি হওয়ার পরও বাঙালি হিন্দুরা এর সুবিধা নিতে আবেদনপত্র জমা দেননি , বিজেপির কাছে এটা কার্যত অসহ্যকর বিষয় ।নব আঙ্গিকে এসআইআর – এর সঙ্গে এই ব্যাপারটি কি যুক্ত , এ প্রশ্নও উঠেছে। কিন্তু যাঁদের যথাযথ নথিপত্র নেই ,সিএএ-এর দোহাই দিয়ে তাঁরা তো এসআইআর ‘বৈতরণী’ পার হতে পারবেন না।আনুষঙ্গিক নথিপত্র দেখাতে না পারলে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত তারিখে তাঁদের নাম বাদ পড়বেই । পরবর্তীতে সিএএ – তে আবেদন করলেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তড়িঘড়ি নাগরিকত্ব লাভ সম্ভব নয়। ফলে যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে না , তাঁদের গভীর সমস্যার মধ্যে পড়তেই হবে।বিজেপি নেতারা কি তখন তাঁদের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন ? নামকাটা ভোটাররা যে তারিখের মধ্যে ফের আবেদন করার সুযোগ পাবেন , সেই সময়সীমায় সিএএ ‘বিশল্যকরণী’ হয়ে উঠবে ,এমন নিশ্চয়তা কোথায় ? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী ,তাঁরা চিহ্নিত হওয়ার পর দেশ থেকে নির্বাসিত হবেন । এই নির্বাসন কি শুধু মুসলিম সমাজের জন্য , এই মুহূর্তে এটাও এক বড় প্রশ্ন। বিশ্লেষণে “নিউজটিউজ বাংলাক্রম লাইভ” সম্পাদক শংকর দে ।
কত ভোটারের নাম কাটা যাবে ? কী তাঁদের ভবিতব্য ? ‘ডি’ ভোটারের তকমা লাগিয়ে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বা আটক কেন্দ্রে বন্দি করে রাখা , না দেশের সীমার বাইরে টেলে দেওয়া ? অসমের গোয়ালপাড়ায় অবস্থিত ভারতের বৃহত্তম ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’, যার আরেকটি নাম ‘ট্রানজিট ক্যাম্প’- এ কি অতিবাহিত করতে হবে তাঁদের অবশিষ্ট জীবন ? কিন্তু ,সেখানে তো থাকার জায়গা তিন হাজারের মতো। কোটি মানুষ তবে থাকবেন কোথায় ? নাগরিকত্ব সংশোধন বিধি কি পারবে বাঙালি হিন্দুদের ভোটাধিকার রক্ষা করতে ? কী হবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ভবিষ্যৎ ? ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি উথালপাথাল। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়; বলা যায়, সারা দেশই তাকিয়ে আছে তৃণমূল কংগ্রেস শাসিত এই রাজ্যের দিকে। এ বার ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন নিয়ে সর্বত্র যে ‘সাজ সাজ রব’, বা ‘ রণসজ্জা’ দৃশ্যমান , অতীতে সেটা দেখা যায়নি ।দেশে আট বার ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন’ হয়েছে ,কখনও এত শোরগোল কিন্তু শোনা যায়নি।নির্বাচন কমিশনকে চাপিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনেই বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পেয়ে গিয়েছে।দেখা যাচ্ছে , ভোটার তালিকার এসআইআর নিয়ে উৎসাহের অন্ত নেই বিজেপির।পক্ষান্তরে , রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এর কড়া বিরোধিতা করে পথে নেমেছে । এসআইআর আতঙ্কে ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ক’জনের আত্মহত্যার খবর পাওয়া গিয়েছে । অসমে তো বারবার নাগরিকত্বের প্রশ্নে ভীত – সন্ত্রস্ত অনেক মানুষ নিজেদের জীবন শেষ করে দিয়েছেন ।
পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ ঘটছে ,এ নিয়ে বিজেপির সুর সব সময়ই ছিল চড়া। লালকৃষ্ণ আডবাণী এনডিএ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা উপ-প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে অন্তত দু ‘কোটি অনুপ্রবেশকারী রয়েছেন। এ ধরনের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন স্তরের বিজেপি নেতৃত্বের মুখে।তৃণমূল থেকে আসা নব্য বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীও দেড় কোটি অনুপ্রবেশকারী ভোটারের কথা উল্লেখ করে , এখন একটু পিছিয়ে এক কোটি বলছেন। যদিও লালকৃষ্ণ আডবাণীর ওই মন্তব্যের পর তেইশ বছর কেটে গিয়েছে। ইতিমধ্যে এসে গিয়েছে অনুপ্রবেশকারী এবং শরণার্থী তত্ত্ব। সিএএ কার্যকর হওয়ার ছয় বছর হয়ে গেলেও বাঙালি হিন্দুদের এ সংক্রান্ত আবেদনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যায়নি ।যদিও পাকিস্তানি হিন্দুদের সিএএ-তে কিছুটা হলেও আবেদন করতে দেখা যাচ্ছে। অনেকে এই আইনের বলে পেয়ে গিয়েছেন ভারতীয় নাগরিকত্ব।’শরণার্থী’ হয়ে এ দেশে আসা বাঙালি হিন্দুরা মুখ্যত যে কারণে সিএএ-তে আবেদন করছেন না; সেটা হলো , বাংলাদেশী বা পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা হিসেবে সেখানে নিপীড়নের শিকার হওয়ার যাবতীয় তথ্য তুলে ধরতে হয় ।যেহেতু তাঁরা এ দেশে এসে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি সহ অন্যান্য নথিপত্র পেয়ে গিয়েছেন ,তাই নতুন করে নিজেদের বাংলাদেশী ঘোষণা করার ঝুঁকি নেবেন কেন ? এটা যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য কথা ।কিন্তু ,বর্তমান এসআইআর আবহে এ বার কি চাপে পড়ে বাঙালি হিন্দুরা সিএএ – মুখো হবেন ? এটাই কি একটা পরিকল্পিত ছক ?
এত কাঠখড় পুড়িয়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধি হওয়ার পরও বাঙালি হিন্দুরা এর সুবিধা নিতে আবেদনপত্র জমা দেননি , বিজেপির কাছে এটা কার্যত অসহ্যকর বিষয় ।নব আঙ্গিকে এসআইআর এর সঙ্গে এই ব্যাপারটি কি যুক্ত ,এ প্রশ্নও উঠেছে।কিন্তু যাঁদের যথাযথ নথিপত্র নেই , সিএএ-এর দোহাই দিয়ে তাঁরা তো এসআইআর ‘বৈতরণী’ পার হতে পারবেন না।আনুষঙ্গিক নথিপত্র দেখাতে না পারলে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত তারিখে তাঁদের নাম বাদ পড়বেই ।পরবর্তীতে সিএএ – তে আবেদন করলেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তড়িঘড়ি নাগরিকত্ব লাভ সম্ভব নয়।ফলে যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে না , তাঁদের গভীর সমস্যার মধ্যে পড়তেই হবে।বিজেপি নেতারা কি তখন তাঁদের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন ? নামকাটা ভোটাররা যে তারিখের মধ্যে ফের আবেদন করার সুযোগ পাবেন , সেই সময়সীমায় সিএএ ‘বিশল্যকরণী’ হয়ে উঠবে , এমন নিশ্চয়তা কোথায় ? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী ,তাঁরা চিহ্নিত হওয়ার পর দেশ থেকে নির্বাসিত হবেন । এই নির্বাসন কি শুধু মুসলিম সমাজের জন্য , এই মুহূর্তে এটাও এক বড় প্রশ্ন।
অনেকে এসআইআরকে রাষ্ট্রীয় নাগরিকপঞ্জি নবায়নের সঙ্গে তুলনা করছেন । অসমে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নাগরিকপঞ্জি নবায়নের কাজ হয়েছে , তাতে জনগণকে অনেক দুরুহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ভিত্তিবর্ষ ছিল ১৯৭১ । এর আগেকার বিভিন্ন পারিবারিক যোগসূত্র , ‘লিগ্যাসি’ অর্থাৎ উত্তরাধিকারের প্রামাণ্য নথি দিতে হয়েছে । শুনানি হয়েছে বার বার । পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকপঞ্জি নবায়ন হলে ভিত্তিবর্ষ হবে ১৯৫১ বা ১৯৫৫।’আসাম চুক্তি’ – র জন্য অসমে তা হয় ১৯৭১ । ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া কিন্তু এতটা কঠোর নয়।পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেখানে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই আর কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। ২০০২ – এ ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের আগের নথি দিতে হবে । ভিন রাজ্যের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন ,অসমে কেন ভোটার তালিকার এসআইআর হচ্ছে না? তাঁরা জানেন না ,অসমে কথিত ‘ খিলঞ্জিয়া’ বা’ ভূমিপত্র’ ব্যতীত মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককে যখন – তখন নাগরিকত্বের অগ্নিপরীক্ষায় কোনও না কোনও ভাবে অবতীর্ণ হতে হয়। পুলিশ ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে যে কোনও সরকারি কাজকর্মে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের নথি দেখাতে হয় ,যদিও ‘আসাম চুক্তি’ অনুযায়ী ভিত্তিবর্ষ ১৯৭১। বলা যায় ,এ ভাবে প্রতিদিনই মূলত অসমের বাঙালিদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জীবন যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় , ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের একটা অংশ ভারতে এসেছিলেন। মূলত, পশ্চিমবঙ্গেরই বাসিন্দা হয়ে যান তাঁরা। কিছু ত্রিপুরায়, খুব অল্প সংখ্যক এসেছিলেন অসমে। দেশের অন্যত্র রয়েছেন কেউ কেউ। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের আগের সরকারি নথি তাঁদের কাছে থাকার কথা। শুধু তাই নয় ,২০০২ -এর আগে যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন , তাঁদের নাম ওই বছরের ভোটার তালিকায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে । তবে ,২০০২ – এর ভোটার তালিকায় তাঁদের সন্তানদের নাম না থাকলে ১৯৮৭ -এর আগেকার সরকারি নথি লাগবেই । মোটামুটি ভাবে দেখা যাচ্ছে ,এই পঁচিশ বছরে যাঁরা বাংলাদেশ বা অন্য দেশ থেকে ভারতে এসেছেন , তাঁরাই বিপদে পড়তে পারেন।এর মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা কত , মুসলিম জনসংখ্যা কত; সে দিকেই দৃষ্টি সকলের ।পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকভাবে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপ্রবেশ ঘটেছে , এই কথাটুকুর ভিত্তি কতটুকু ; এ বার তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যাবে ।
বিজেপি ভাবছে , এসআইআর – এর অভিযানে এক কোটি মুসলিম ভোটারের নাম বাদ গেলে চরম বিপর্যয়ে পড়বে তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ভরসায়ই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ‘হৈ হৈ – রৈ রৈ’ করে ক্ষমতায় বসার স্বপ্ন দেখছে।কিন্তু ,বাস্তব অবস্থান কি ঠিক তা-ই। মতুয়া সমাজ সহ বিজেপি তথা সিএএ সংজ্ঞায়িত ‘শরণার্থী’ হিন্দুদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কর্তন হওয়ার সংখ্যা কত গিয়ে দাঁড়ায় , এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । যাঁদের নাম বাদ পড়বে ,নির্ধারিত সময়সীমায় সিএএ-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম তোলা সম্ভব নয় ,অন্তত তাই মনে হচ্ছে । মতুয়াসহ অন্যরা যে শুধু বিজেপিকে ভোট দেন এমন নয় ; এর মধ্যে যেমন তৃণমূল কংগ্রেসের ভিত রয়েছে ,তেমনি কিছু সংখ্যক রয়েছেন কংগ্রেসে ,বামপন্থায়ও।ফলে বিজেপি নেতাদের এখন একটাই লক্ষ্য , সিএএ-এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসী ‘শরণার্থীদের’ পুরো অংশটিকেই তাঁদের দলের অনুকূলে নিয়ে আসা।কিন্তু ,প্রকৃতপক্ষে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে আদৌ কি তা সম্ভব ? এর উত্তরে বলতে হয়, ‘অবশ্যই না।’ তা’হলে শরণার্থীরা এ ভাবে বিড়ম্বনায় পড়ে গেলে কার কী লাভ ,কার কী ক্ষতি ; সেটা কিন্তু এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না । তবে এটা ঠিক ,’ শরণার্থীদের একটা অংশ ভোটারহীন হয়ে গেলে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় অস্তিত্বের সংকটে পড়ে গেলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাম্প্রতিক ভোটপ্রাপ্তির ধারায় ব্যাপকভাবে ধ্বস নেমে যাবে ।এত দিন ধরে শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের বিজেপি নেতারা নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্রের মতো ,এসআইআর নিয়ে কথাবার্তা বলে আসছেন । শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতি যদি ভিন্ন হয় ,তা’হলে এর চরম খেসারত দিতে হবে তাঁদের । পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারা হয়তো জানেন না ,অসমে বাঙালি হিন্দুদের নিয়ে তাঁদের দলের নীতি মোটেই স্বচ্ছ নয়।বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অসমীয়া জাতীয়তাবাদেকই অসমে অধিকতর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন । পশ্চিমবঙ্গে তাঁরা কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে হিন্দুত্বকে ‘ইস্যু’ করে চলেছেন ।
এসআইআর – এর প্রভাবে বা অভিঘাতে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস – বিজেপি একেবারেই সম্মুখ-সমরে।কুড়ি বছর আগে সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের দাবিতে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সোচ্চার ছিলেন ,তখন সংসদে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকেই তিনি সবচেয়ে বড় প্রত্যাহ্বান বলে উল্লেখ করেছিলেন ।এখন সেটা তাঁর কাছে কতটুকু ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়ায় ,সেটাই দেখার ।
[ প্রতিবেদনের ছবি : এসআইআর নিয়ে জনতা যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজপথে। ]
