একাংশ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবাধ দুর্নীতির কথা জনগণের কাছে অজ্ঞাত নয়।কোনও কোনও বিধায়ক, সাংসদ এক বারের কার্যকালেই যে ভাবে ‘বিত্তবান’ হয়ে উঠেন, তা অনেকের কল্পনারও বাইরে। কী ভাবে এটা সম্ভব? দুর্নীতি দমনে লোকপাল তথা লোকায়ুক্তের কথা এখন শোনা যায় না। বিশ্লেষণে ‘নিউজটিউজ বাংলাক্রম লাইভ’ সম্পাদক শংকর দে ।

“ম্যাডাম টেন পার্সেন্ট।” ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯৮; একত্রিশ বছর ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন টিএনজে সুহার্তো।তাঁর সহধর্মিণী সিতি হার্তিনাকে বলা হতো “ম্যাডাম টেন পার্সেন্ট।” সিতি হার্তিনা ইন্দোনেশিয়ার প্রতিটি বড় প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ থেকে দশ শতাংশ ‌’কমিশন ‘ নিতেন বলে জনশ্রুতি ছিল। পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারিকেও বলা হতো “মিস্টার টেন পার্সেন্ট ।” তা‌ঁর স্ত্রী বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন আসিফ আলি জারদারি বিভিন্ন কাজের জন্য ‌দশ শতাংশ কমিশন নিতেন । এ রকম দেশে – বিদেশে বিভিন্ন স্তরের রাষ্ট্র পরিচালকরা ‘কমিশন’ নিয়ে কাজ করাটা দীর্ঘকাল ধরে একেবারে স্বাভাবিক রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় অনেকের পত্নীদের নামও। তাঁদের নামের পাশে এ ভাবে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ‘বিশেষণ ‘। ব্যাপক দুর্নীতির গ্রাসে ব্যাহত হচ্ছে ওই সব দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াও। “ম্যাডাম টেন পার্সেন্ট”,”মিস্টার টেন পার্সেন্ট”-এর যুগ হয়তো বর্তমানে আর নেই ।এখন নিদেনপক্ষে “মিস্টার টুয়েন্টি পার্সেন্ট”, “ম্যাডাম থার্টি পার্সেন্ট ” – এর যুগ ।ভারতের কেন্দ্রে এবং রাজ্যে রাজ্যেও অবাধ দুর্নীতির খবর বার বার প্রকাশ্যে আসছে।

নূপুর বরা ‘অসম সিভিল সার্ভিস’ আধিকারিক। মুখ্যমন্ত্রীর দুর্নীতি বিরোধী জালে পড়ার পর তাঁর কার্যকলাপ নিয়ে একের পর এক অন্তর্তদন্তের খবর প্রকাশ্যে এসেছিল। প্রথিতযশা সঙ্গীতশিল্পী জুবিন গর্গ-এর আকস্মিক প্রয়াণে রাজ্য শোকের আবহে এই বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়েছে ।তবে,একটু অপেক্ষা ; দুর্নীতির দায়ে, ‌আবারও হয়তো কেউ সংবাদ শিরোনামে এসে যাবেন।কিছু দিন এ নিয়ে নানা রকম মজাদার কথাবার্তা,ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পর তা চাপা পড়ে যাবে ,এটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতি যে তিমিরে, সেখানেই থেকে যাচ্ছে।মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কিছুটা হতাশার সুরে বলেছিলেন , ২০১৯ ব্যাচের এপিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নূপুর বরা মেধার ভিত্তিতে এসিএস নিযুক্তি পেয়েছিলেন ।চাকরি পেতে যেহেতু কোনও ‘উৎকোচ’ দিতে হয়নি,তাই তাঁর কাছে এ ধরনের দুর্নীতি প্রত্যাশিত ছিল না ।আসলে বিষয়টি কি এ রকম ? হিমন্তবিশ্ব শর্মা ছাত্র সংগঠন করে, একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে রাজনীতি করে আজ রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।অনেকে এমনও বলে থাকেন,রাজ্যে কোথায় – কখন- কী ঘটছে , তা হিমন্তবিশ্ব শর্মার নখদর্পণে থাকে । পড়াশোনায় কেউ মেধাবী হলেই ব্যক্তি জীবনে তাঁর সততা থাকবে ,এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। মুখ্যমন্ত্রীর এটা না জানার কথা নয়, কার্যত,তিনি তা সম্যকভাবে অবহিত ।

এ দেশে দুর্নীতিগ্রস্তদের তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ বিশেষত, একাংশ রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে আমলা, বিচারক, বাস্তুকার, চিকিৎসক, শিক্ষক, ঠিকাদার,ব্যবসায়ী সহ করণিক স্তরের কর্মচারী এবং নানা বিভাগের আধিকারিকরাও।যাঁরা সততা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে চান, প্রতি মুহূর্তে তাঁদের কঠিন প্রত্যাহ্বান মোকাবিলা করতে হয় । বলা যায়,‌দেশজুড়ে সর্বভারতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত মেধার ভিত্তিতে যাঁরা নিযুক্তি পান,আইএএস ,আইপিএস ,‌‌আইআরএস, আইএফএ‌স ; তাঁদের কেউ কেউ আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হন। ‘কপাল মন্দ’ হলে কদাচিৎ বিভিন্ন কার্যকারণে ‘‌জেলযাত্রা’ হয় কারও ‌কারও।তবে তাতেও যে বিশেষ ক্ষতি হয়,এমন নয়।নিয়ম ‌অনুযায়ী , চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর প্রথম তিন মাস পঞ্চাশ শতাংশ মাইিনা প্রদান করা হয়, এর পর থেকে পঁচাত্তর শতাংশ।চাকরিতে পুনর্বহালের পর সমস্ত বকেয়া পাওয়া যায়। দুর্নীতি নিয়ে ‘ছুঁৎমার্গ’ এখন আর বিশেষ দেখা যায় না।বহু ক্ষেত্রেই দুর্নীতি একটা ‘প্রাতিষ্ঠানিক ‘স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছে। আর এটা সম্ভব হয় একাংশ দুর্নীতিপরায়ণ ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যেই । সর্বস্তরে’দুর্নীতির জয়যাত্রা’ সূচিত হয় তাঁদের ‘প্রশ্রয়পুষ্ট’ হয়ে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভারতীয় গণতন্ত্রের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো, ‘‌আমলাতন্ত্র।’ আমলাদের প্রধান কাজ হলো ,সরকার গৃহীত নির্ধারিত নীতি ও নির্দেশনামা বাস্তবায়িত করা, প্রশাসনিক পরিকাঠামো যথাযথ ভাবে পরিচালিত করা, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদের সঠিক পরামর্শ প্রদান করা এবং সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি রূপায়ণ করা।নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করে সরকারি পরিষেবাসমূহ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা আমলাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে ।‌ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভ হলেন,  সরকারের সেই সব কর্মকর্তা ও নীতি নির্ধারক, যাঁরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন এবং নির্দিষ্ট কার্যকালের জন্য রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন।তাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিমণ্ডলী এবং রাষ্ট্রপতি।এ ছাড়া রয়েছেন সাংসদবৃন্দ ।তাঁরাই সর্বাত্মকভাবে সরকারি নীতি প্রণয়ন,প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দেন।আর রাজ্যে রাজ্যে রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ ও রাজ্যপাল ।রয়েছেন বিধায়কবৃন্দ ।রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত সকল কিছুর কর্তৃত্ব তাঁদের হাতে ।এই বৃত্তের মধ্যে সরকারি কার্যালয়ে যদি অবাধ দুর্নীতি হয় , এর দায়ভার তবে কার উপর বর্তায় ? পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন ,একাংশ প্রভাবশালী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ‘ভাগবাটোয়ারা’ অংকেই নির্ধারিত হয় সব কিছু।উপর থেকে নিচ ;একটা শক্তিশালী ‘নেটওয়ার্ক’ ব্যতীত ধারাবাহিক দুর্নীতি সম্ভব নয়।নূপুর বরাদের মতো আধিকারিকরা যখন সরকারি প্রশাসনিক বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন, তখন প্রথমে ইচ্ছে – অনিচ্ছেয় সেই ‘নেটওয়ার্ক’-এ জড়িয়ে পড়েন।ক্রমশ,প্রভূত ‌অর্থের ‘মায়াজালে’আবদ্ধ হন।বেপরোয়া হয়ে জড়িয়ে পড়েন নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে।নূপুর বরার মতো কত যে উদাহরণ রয়েছে ,এর ইয়ত্তা নেই ।মোটা অংকের অর্থ করায়ত্ত করার নেশায় নিরন্তর ‘হয়কে নয়’ এবং ‘নয়কে হয়’ করছেন এরা।

একাংশ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবাধ দুর্নীতির কথা জনগণের কাছে অজ্ঞাত নয়।কোনও কোনও বিধায়ক, সাংসদ এক বারের কার্যকালেই যে ভাবে ‘বিত্তবান’ হয়ে উঠেন ,তা অনেকের কল্পনারও বাইরে । কী ভাবে এটা সম্ভব ? ‌দ্বিতীয় বার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় তাঁরা যে শপথনামা দাখিল করেন , তাতে দেখা যায়; তাঁদের ‘গৃহবধূ ‘স্ত্রীরা হঠাৎ করে বড় ব্যবসায়ী হয়ে গিয়েছেন । বহু স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি তাঁদের নামে । অন্যান্য নিকট আত্মীয়রাও সেই সুবাদে ‘বড়লোক’ হয়ে গিয়েছেন । আয় বহির্ভূত যে বিশাল সম্পত্তির পাহাড় তাঁরা গড়েন, এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে? স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য জবাবদিহিতার ব্যবস্থা কোথায় ? বছর কয়েক ধরে সারা দেশে বিভিন্ন রাজ্যে কিছু প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে ইডি ,সিবিআই – এর মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো। কিন্তু সেখানে’ টার্গেট ‘ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা।কটাক্ষ করে বলা হয়, ‘বিজেপির ওয়াশিং মেশিন’-এ ঢুকে গেলে দুর্নীতির সব কালো দাগ ধুয়ে মুছে ‘শ্বেতশুভ্র’ হয়ে যায়! গত কয়েক দশকে যে পরিমাণ তহবিল তছরুপ হয়েছে ,তা সঠিকভাবে কার্যকর হলে পাল্টে যেত ভারতের চেহারাই।অথচ , দুর্নীতি প্রতিরোধের নামে বহু ক্ষেত্রেই ‘তামাশা ‘হচ্ছে কার্যত।

দেশজুড়ে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের পর ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে লোকপাল এবং লোকায়ুক্ত আইন সংসদে পাস হয়, রাজ্যসভায় ১৭ ডিসেম্বর এবং লোকসভায় পাস হয় পরদিন ১৮ ডিসেম্বর । ২০১৪-এর ১ জানুয়ারি তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সম্মতি লাভ করে। ১৬ জানুয়ারি থেকে এই ‌আইন ‌কার্যকর হয়। ভারতে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির তদন্ত ও বিচারের জন্য, লোকপাল এবং লোকায়ুক্ত প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণীত হয়েছিল।কিন্তু , পরিস্থিতি সেই তিমিরেই। এখন আর এ সবের কথা তেমন শোনা যায় না।

নূপুর বরার খবর প্রকাশ্যে আসার পর অন্যান্য দুর্নীতিপরায়ণ আধিকারিক বা কর্মচারীরা নিজেদের শুধরে নিয়েছেন, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই ।যাঁরা এই কুচক্রে জড়িয়ে পড়েন , তাঁদের সেখান থেকে ফিরে আসা সহজ নয়।এক জন, দু’জনকে জেলে পুরলে ক’দিন একটু হৈ চৈ হয় বটে;কিন্তু, কাজের কাজ হয় না কিছুই । আইন-সভা যদি সঠিক দিশায় পরিচালিত না হয়, তা’হলে আমলাতন্ত্র হোক, আর অন্য স্তম্ভই হোক ; অনিয়ম, সঙ্গতি থেকে যায় সব কিছুতেই। এর প্রতিবিধান হবে কী ভাবে ? এটাই সব চেয়ে বড় প্রশ্ন ।

[প্রতিবেদনের ছবি সৌজন্যে ফেসবুক]

Shankar Dey

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *