শ্যামকানু মহন্ত, সিদ্ধার্থ শর্মা পুলিশের কব্জায়। জুবিনের খুড়তুতো ভাই ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সন্দীপন গর্গের বক্তব্যেই নির্ভর করছে অনেক কিছু।বিশ্লেষণে ‘নিউজটিউজ বাংলাক্রম লাইভ’ সম্পাদক শংকর দে।
আলফা সময় বেঁধে দিয়েছিল আটচল্লিশ ঘন্টা ।কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈ ঘোষণা করেছিলেন, আন্দোলনে নামছেন। কর্মসূচি ‘রাইজর দল’ – এর অখিল গগৈ, এজেপি-র লুরিনজ্যোতি গগৈ সহ অন্যদেরও। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা বলেছিলেন ,ছয় অক্টোবর গুয়াহাটিতে হাজির হতেই হবে শ্যামকানু মহন্ত এবং সিদ্ধার্থ শর্মাকে। এর পরই সমূহ অভিযোগের কাঠগড়ায় থাকা শ্যামকানু মহন্ত, সিদ্ধার্থ শর্মা ধরা দিলেন পুলিশের জালে। নিরাপত্তা জনিত কারণে বিমানবন্দর থেকে তাদের ‘বুলেট প্রুফ’ গাড়িতে নিয়ে আসা হয়। স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন উঠছে যে, আলফার চরম হুমকিতে দুই অভিযুক্ত কি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন? এখন তদন্তের একটা বড়সড় প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। এ দিকে, জুবিন গর্গ যে আলফার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, এমনটা নয়।বরং আলফা যখন গুয়াহাটিতে হিন্দি গান নিষিদ্ধ করেছিল, তখন জুবিন গর্গ এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেছিলেন, আলফার এখন কোনও ভিত্তি নেই; তাই এ সব বলে প্রচারের আলোয় আসতে চাইছে ।আলফার তথাকথিত নিষেধাজ্ঞা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে একের পর এক মঞ্চে জুবিন গর্গ হিন্দি সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। এই হলেন জুবিন গর্গ।
মহানায়কের মতোই মহাপ্রস্থান সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, কবি, চিত্রনাট্য লেখক, পরোপকারী জুবিন গর্গ-এর। তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে তোলপাড় অসমের জনজীবন। দ্রুত, যথাযথ বিচার চেয়ে একাংশ নাছোড়বান্দা জনতা পথে-প্রান্তরে সোচ্চার ভূমিকায় অবতীর্ণ। জুবিন গর্গের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে অসম সরকারের ‘স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম’ ইতিমধ্যে ময়দানে নেমে পড়ে। গ্রহণ করা হয় একের পর এক পদক্ষেপ। আর এই প্রেক্ষাপটে আলফার বিবৃতিতে ঘটনাপ্রবাহ একটা নতুন মোড় নেয়। জুবিন গর্গের ‘খুনীদের’ গুলি করে হত্যা করা হবে বলে ঘোষণা করেছিল আলফা ।জুবিন গর্গের ‘রহস্যমৃত্যু’ উদঘাটনের দাবিতে অসমবাসী যে ভাবে প্রতিবাদে সোচ্চার , মানুষ যে ভাবে শোক বিহ্বল; সেটা থেকে আলফা জনসমক্ষে ‘ত্রাতার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ। প্রশাসন যন্ত্র তথা সরকার, বিচার ব্যবস্থা থেকেও ‘অসামান্য’ ক্ষমতার অধিকারী আলফা, এই বার্তা দিতে চেয়েছে তারা। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই বিষয়টিতে যুব সমাজকে প্রভাবিত করার লক্ষ্য তাদের।তা’হলে প্রশ্ন হলো, দুই মূল অভিযুক্ত শ্যামকানু ও সিদ্ধার্থ পুলিশের কব্জায় আসার পর জুবিন গর্গের রহস্যমৃত্যু কাণ্ড কোথায় গিয়ে ঠেকছে? জুবিন গর্গ যখন সিঙ্গাপুরের সাগরে’ স্কুবা ডাইভিং’ করছিলেন, তখন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাঁর খুড়তুতো ভাই সন্দীপন গর্গ।’ সিট’ তাঁকে জেরা করে চলেছে। ইতিমধ্যে গরিমা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, পুলিশের কাছে বিস্তারিত বলা উচিত সন্দীপনের। সন্দীপন ‘অসম পুলিশ সার্ভিস’ আধিকারিক। গরিমা জানান ,সন্দীপন কখনও বিদেশ যাননি, তাই দাদার সঙ্গে গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরে। সব মিলিয়ে সন্দীপনের সাক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনও চাপের মুখে তিনি রয়েছেন কিনা ,তা স্পষ্ট নয়। তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ বক্তব্যের উপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে। এ ছাড়া ,আগেই গ্রেফতার করা হয়েছিল যন্ত্রশিল্পী শেখরজ্যোতি গোস্বামীকে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রথম থেকেই জানান, জুবিন গর্গের পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় অবশ্যই আস্থা রাখতে হবে।রাজনৈতিক পরিসরকে ঊর্ধে রেখে জুবিন অনুরাগীরা চান, খুব দ্রুত যথাযথ অন্তর্তদন্তে ‘সিট ‘ রহস্যের জাল ভেদ করুক।আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, বিষয়টিকে ঘিরে এখন অবধি একটা ‘হ-য-ব-র-ল’ পরিস্থিতি বিরাজমান; কিন্তু, ‘সিট’ জানে, কোথা থেকে শুরু হবে তদন্ত, আর কোথায় গিয়ে এর শেষ। অসম পুলিশের এই সুনামটুকু রয়েছে। দিল্লিতে সিদ্ধার্থ শর্মাকে পেয়েও গুয়াহাটিতে আনা হয়নি। জুবিন গর্গের দেহ দিল্লি থেকে গুয়াহাটি নিয়ে আসার পর এ কথা বলেছিলেন হিমন্তবিশ্ব শর্মা। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছিলেন জুবিন – পত্নী গরিমার আবেদনের কথা।গরিমা শইকিয়া গর্গ ‘ভিডিও বার্তায়’ যা বলেছিলেন; এর নির্যাস হলো, জুবিন গর্গের শেষকৃত্যে সিদ্ধার্থ শর্মার থাকা বাঞ্ছনীয়।গরিমা কখনও এ কথা বলেননি যে, সিদ্ধার্থ অপরাধী হলে তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে।তাৎক্ষণিকভাবে অসহায়া গরিমার ওই ‘ভিডিও বার্তার’ যথেষ্ট তাৎপর্য রয়েছে। জুবিন গর্গের বিষয়- আশয় সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত নন গরিমা।স্বাভাবিকভাবেই, জুবিন গর্গের আকস্মিক চলে যাওয়ায় ‘বৈষয়িক’ দিক থেকে গরিমা কার্যত দিশাহারা হয়ে পড়েন।গরিমা বলেছিলেন, জুবিন গর্গের ভাইয়ের মতো সিদ্ধার্থ। যেহেতু, জুবিন গর্গের আর্থিক লেনদেন তথা সম্পত্তি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সিদ্ধার্থ শর্মার কাছে, সে ক্ষেত্রে গরিমার এ ধরনের মন্তব্য নিতান্তই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু, সেই ‘ভিডিও বার্তার’ পর একাংশ ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে যে ভাবে গরিমাকে অভব্য মন্তব্য করেছেন; তাঁরা আর যাই হোন, জুবিন অনুরাগী হতে পারেন না।
অন্য দিকে, জুবিন গর্গের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংকীর্ণ রাজনীতি যদি ক্রমশ প্রসারিত হয়, তা’হলে কাদা ছোড়াছুঁড়ি ছাড়া আর কিছুই হবে না।গৌরব গগৈ সহ অন্য বিরোধী নেতারা এ ব্যাপারে অবশ্যই শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবেন।তবে, অকারণ বিরোধিতা কাম্য নয়। প্রকৃত জুবিন অনুরাগীরা চান; রহস্যমৃত্যুর উদঘাটন, ন্যায়বিচার এবং দোষীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। বিচার হবে ভারতীয় আইনে ।আলফার গুলিতে যেমন নয় ,তেমনি বাংলাদেশ বা নেপাল ‘মডেল’-এ, বিদেশি শক্তি পরিচালিত’ জেন জি ‘তাণ্ডবেও নয়। গণতন্ত্রকামী মানুষ এটাই চান। কারণ, এর ফলে প্রকৃত তথ্য ও সত্য উদঘাটিত হয় না; চাপা পড়ে যায় মূল ঘটনা।তাই, কোনও হঠকারিতা নয়; সম্পূর্ণ বিচার প্রক্রিয়া না হওয়া অবধি জুবিন অনুরাগীদের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় থাকতে হবে। গরিমা শইকিয়া গর্গ উচ্চশিক্ষিতা, অত্যন্ত স্থিতধী। সকল দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করে যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। কখনও একটু রূঢ় মন্তব্য বা বিরূপ আচরণ করতে দেখা যায়নি তাঁকে। তাঁর একটাই কথা, তিনি ন্যায়বিচার চান।
জুবিন গর্গের এই যে আকস্মিক মৃত্যুবরণ, তা যথেষ্ট রহস্যাবৃত; সামগ্রিক অবস্থাদৃষ্টে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ এমনটাই মনে করছেন।প্রতিভাধর জুবিন গর্গের জীবন প্রবাহের দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায়, সঙ্গীত সাধনার শিখরে অবস্থান করেছেন তিনি।যখন যা ভালো লেগেছে, তা-ই করেছেন।আর্থিক বা অন্য কোনও লাভ – ক্ষতি, হিসেব – নিকেশের অংকে জীবনকে নিরূপিত করেননি তিনি। কোনও প্রভাবশালী মহল বা ব্যক্তি বিশেষের মন জুগিয়ে কথা বলেননি। ছিলেন যথেষ্ট আবেগপ্রবণও। এর ফলে তাঁর সব সিদ্ধান্ত যে সঠিক, এমন নয়। তিনি একটা মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, যা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। মানুষ মাত্রেই কোনও না কোনও ভ্রান্তি থাকে, তা তিনি যতই কৃতী হোন না কেন। তবে, এ রকম দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যতিক্রমী বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী যাঁরা, ব্যক্তি গণ্ডি পেরিয়ে যাঁদের নাম উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়, তাঁদের সরলতার সুযোগ নিয়ে কাছের লোকেরা তো বটেই; অনেকেই নিজেদের আখের গুছিয়ে থাকেন। পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, শ্যামকানু মহন্ত এবং সিদ্ধার্থ শর্মার মতো ব্যক্তিরা জনপ্রিয় জুবিন গর্গকে কখনও হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেননি। তাঁদের ভালো লাগা বা ভালোবাসা ছিল প্রভূত স্বার্থ আদায়ের ছলাকলা মাত্র। অথচ, জাতি-ধর্ম – বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের নয়নমণি জুবিন গর্গ। জনতার হৃদয়ের গভীরতম প্রকোষ্ঠে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত তিনি। কিন্তু, শ্যামকানু – সিদ্ধার্থের কাছে এর কোনও মূল্য নেই।জুবিন গর্গ আগেই কোথাও কোথাও হতাশার সুরে জানিয়েছিলেন যে, তাঁকে অর্থ উপার্জনের ‘যন্ত্র’ বানানো হয়েছে। তাই তো ‘নর্থ-ইস্ট ফেস্টিভ্যাল’ – এর নামে জুবিন গর্গকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়ে তাঁর জীবন শেষ করে দেওয়া হলো।পাশাপাশি, ‘নর্থ-ইস্ট ফেস্টিভ্যাল’ – এর মতো অনুষ্ঠান করে শ্যামকানুরা সরকারি অর্থ যে লুটেপুটে খান, তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ।এই ভাগ-বাটোয়ারাতে কারা কারা জড়িত, তাদের নাম প্রকাশ্যে আনতে হবে।
জুবিন গর্গের অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য যাঁরা দায়ী, তাদের অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চিহ্নিত করে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনও রকম সংশয়ের বাতাবরণ যাতে তৈরি না হয়, অসম সরকারকে তা সুনিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সবাই কিন্তু তাদের দিকে তাকিয়ে।
