নন্দিলবিশ্ব ও সুকন্যার কথা তুলে ধরে হিমন্তবিশ্ব শর্মাকে প্রত্যাহ্বান জানানোর ‘ক্ষত’নিরাময় হওয়া কঠিন। রাজনৈতিক চর্চায় “নিউজটিউজ বাংলাক্রম লাইভ” সম্পাদক শংকর দে

কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ। এক নাগাড়ে তিন বারের বিধায়ক হিসেবে যখন ‌প্রচারের আলোয় এসে গিয়েছিলেন, তখনই আর নিজের জায়গাটুকু ধরে রাখতে পারলেন না।কী নিজের বিধানসভা কেন্দ্র, কী স্বীয় বিশ্বাসযোগ্যতা; ওলটপালট হয়ে গেল সব কিছুই। অকূল সাগরে যখন হাবুডুবু ‌খাচ্ছেন, তখন কাটিগড়াকে ভর করে তীরে ভিড়তে চাইছেন তিনি। এই মুহূর্তে সব চেয়ে বড় প্রশ্ন, কাটিগড়ায় মনোনয়ন পেয়ে যাবেন, এই ধারণা তিনি পোষণ করছেন কী ভাবে? সর্বত্র এমন একটা ধারণা তিনি ‌‌‌‌ছড়িয়ে দিয়েছেন যে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার’ আশীর্বাদের হাত’ ‌তাঁর মাথায় রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প, কর্মসূচির কথা আগাম জানিয়ে দিয়ে কাটিগড়ার জনমানসে এই বার্তা দিচ্ছেন, তিনিই এই বিধানসভা কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রক। তাঁর প্রতিটি ‘বাণী বর্ষণে ‘মনে হয়, কাটিগড়ার প্রতি তাঁর দরদ একেবারে উতলে পড়েছে। অথচ, ২০২১ থেকে ২০২৬;‌‌ তৃতীয় দফায় এ‌ই পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত বিধায়ক হিসেবে উত্তর করিমগঞ্জ কেন্দ্রের জনগণের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু, এ‌ই দায়বো‌‌ধকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গিয়ে ‌‌কাটিগড়ায় তাঁর অতি-তৎপরতা সচেতন মহলে কার্যত বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

বর্তমানে ‘ত্রিশংকু’ অবস্থায় রয়েছেন কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ ।কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন; কিন্ত, বিজেপিতে যোগদানের ছাড়পত্র পাচ্ছেন না।মূলত, এই সময়ে তাঁর বিজেপিতে যোগদান করার কথা। কারণ, এখন তিনি দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় পড়লেও ‌উত্তর করিমগঞ্জ বা উত্তর শ্রীভূমি বিধানসভা কেন্দ্রে উপ-নির্বাচনের কোনও সম্ভাবনা নেই। এ ছাড়া, আইনেরও ফাঁক রয়েছে। শাসক বিজেপিতে যোগ দিয়েও বিধায়ক ,সাংসদ পদ হারাননি; দেশজুড়ে রয়েছে এ রকম বহু উদাহরণ। বস্তুত, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের বিষয়টি ভিন্ন ।রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল মনে করছেন, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থকে কিছুটা খেলিয়ে নেওয়া হচ্ছে ।তিনি বিজেপিতে যোগ দিতে চাইলেও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার তরফে ‌কোনও সবুজ সংকেত পাচ্ছেন না। তাঁকে ‌অসমে ছাব্বিশের রাজ্যসভা নির্বাচন অবধি অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে ,এমনটাও শোনা গিয়েছে। ২০২৬-এর ৯ এপ্রিল রাজ্যসভা সদস্য পদের মেয়াদ ‌শেষ ‌হবে ‌তিন সাংসদ ভুবনেশ্বর কলিতা, অজিত ভূঁইয়া এবং রামেশ্বর তেলি-র।মার্চের প্রথম দিকে সম্পন্ন হবে এই নির্বাচন। বিধানসভা নির্বাচনের একেবারে প্রাকপর্বে তিনটি রাজ্যসভা আসনেই জয়লাভ করে ‘মোক্ষম’ শক্তি প্রদর্শন করতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। আর এই প্রেক্ষাপটেই কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের মতো বিধায়কদের বিজেপিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি পরবর্তী রাজ্যসভা নির্বাচন পর্যন্ত ‌ঝুলিয়ে রাখা হবে কি, তা যেমন স্পষ্ট নয়; তেমনি রাজ্যসভা নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেলেই তাঁদের দলে নেওয়া হবে, এর কোনও নিশ্চয়তা নেই।

কংগ্রেসে খুব সুখেই ছিলেন কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ।লাগাতার তিন বারের বিধায়ক।কিন্তু ,মন্ত্রিত্বের অপূর্ণতা তাঁর রয়েছে;‌‌‌‌‌‌‌‌ ঘনিষ্ঠ মহলে এমন হতাশা ব্যক্ত করে ‌‌থাকেন। প্রথম ছিলেন শাসক দল কংগ্রেসের বিধায়ক। পরবর্তী দু’বার বিরোধী পক্ষে; অবশ্য সেটা ‘খাতায়-‌কলমে।’মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা এ কথা প্রায়শই বলে থাকেন যে, কংগ্রেসে তাঁর অনেক আপনজন রয়েছেন ,যাঁরা তাঁকে নিয়মিত গোপন ‌খবরাখবর দিয়ে থাকেন। হিমন্তবিশ্ব শর্মা কংগ্রেসে থাকাকালীন ‌কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ প্রথম বার বিধায়ক হয়েছিলেন ২০১১ ‌খ্রিস্টাব্দে। যে সকল বিধায়ক তখন হিমন্তবিশ্ব শর্মার প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছিলেন, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ এর অন্যতম। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের বিধানসভা নির্বাচনের মাস কয়েক আগে ২০১৫-য়ের ২৩ আগস্ট পার্ষদদের সঙ্গে নিয়ে হিমন্তবিশ্ব শর্মা যখন কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন ,কমলাক্ষ তখন ‌‌‌থেকে গিয়েছিলেন কংগ্রেসে। নানা বাধ্যবাধকতায় হিমন্তবিশ্ব শর্মা ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ কংগ্রেস ত্যাগ করতে পারেননি। তবে ,হিমন্তবিশ্ব শর্মার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক যে অব্যাহত থাকে, তা স্পষ্টতই প্রতীয়মান ।এটা সুবিদিত যে, ‘টিম হিমন্ত’ বলে যে বৃত্ত বিদ্যমান, তাতে যুক্ত ‌‌অন্যান্য দলের কিছু বিধায়কও। কী ভাবে পারস্পরিক ‘সমঝোতা’ হয়,এটা তাঁরা নিজেরাই ‌‌ভালো বলতে পারবেন । ভালোয় ভালোয় সব কিছু চলছিল।তা’হলে গোল বাঁধার প্রেক্ষাপট কী ভাবে তৈরি হলো ? তিন বারের বিধায়ক হিসেবে দলে একটা গুরুত্ব পাচ্ছিলেন। হয়ে যান ‌অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির অন্যতম কার্যনির্বাহী সভাপতি। জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন ।সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ দৃঢ় হতে থাকে ।কিন্তু ,অনর্গল কথা বলতে বলতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন; তাঁর লাগাম কার হাতে রয়েছে! নেপথ্যে কার নিয়ন্ত্রণে ,কার নির্দেশনায় তিনি পথ চলছেন ,তা বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন ।বিজেপির বিরুদ্ধে কথা বলা হয়তো ‘গড়াপেটা ‘ছিল। তাই বলে ‘লক্ষণরেখা’ পেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা, তাঁর সহধর্মিণী রিনিকি ভূঁইয়া শর্মা, তাঁদের পুত্র নন্দিলবিশ্ব শর্মা, কন্যা সুকন্যা শর্মাকে আক্রমণের লক্ষ্য করে নেন।তাঁদের সম্পত্তির বহর নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ শুরু করেন। তাঁর বক্তব্যের ‘ভিডিও’ ভাইরাল হয় সর্বত্র। কাচের ঘরে বসে ঢিল ছুঁড়ছেন, তা ভুলে গিয়েছিলেন। ফল পেলেন হাতে হাতে।ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো হিমন্তবিশ্ব শর্মার।‌’‌সিএম ভিজিলেন্স’ ‌পা‌ঠিয়ে দিলেন কমলাক্ষের অবৈধ সম্পত্তির হদিশ বের করতে।’দুর্নীতি’ করে যে সম্পত্তি করেছিলেন ,এর কিছুটা পাওয়া গেল। এ ছাড়াও তাঁর বিভিন্ন দুর্নীতির কথা উঠে এলো।গ্রেফতারি এড়াতে তখন মরিয়া হয়ে উঠেন।বহু কসরত করে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার সঙ্গে দেখা করে ,তাঁর কাছে ‘নতজানু’ হয়ে গ্রেফতারি এড়ালেন।শুরু হলো ‘উলটপুরাণ।’মুখর হলেন হিমন্তবিশ্ব শর্মা সরকারের বন্দনায়।হিমন্তবিশ্ব শর্মার স্তুতিতে তিনি এখন ‘পঞ্চমুখ!’একেবারে ‘একশো আশি ডিগ্রি’ ঘুরে গিয়ে মুসলিম – বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদীদের’ মন জয় করতে মাঠে নেমেছেন ।দেখা যাচ্ছে ,বরাকের প্রতিষ্ঠিত বিজেপি নেতারা মুসলিম সমাজকে নিয়ে তেমন বিরূপ ভাষায় কখনও প্রকাশ্যে কথা বলেননি।কিন্তু ,কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলছেন নানা ভাবে।অথচ, তিনি যে বিধানসভা কেন্দ্র থেকে এক নাগাড়ে বিধায়ক হয়েছিলেন, তাতে মুসলিম সমাজের এক বড় অংশের সমর্থন ছিল। কিন্তু, তা বেমালুম বিস্মৃত হয়ে যে নেতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, সেটাকে ‘চরম বিশ্বাসঘাতকতা’ ছাড়া আর কী বলা যায় ,সেই ‌প্রশ্ন উঠেছে তাঁর বিধানসভা এলাকায়।

এ সব করে কি কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ বিধানসভা নির্বাচনে কাটিগড়ায় বা অন্যত্র বিজেপি মনোনয়ন পেয়ে যাবেন ? এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে তথা জনমনে।তবে, বিষয়টি এত ‌সরল সমীকরণ নয় যে, তিনি মনোনয়ন পেয়ে যাবেন! মাস কয়েক ধরেই কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ বিজেপিতে যুক্ত হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু , বার বার হতাশ হতে হচ্ছে তাঁকে ।রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে হয়তো চরম মূল্য দিতে হবে কমলাক্ষকে।বাইরে যতই ‘ঠাটবাট ‘বজায় রেখে চলুন না কেন, হিমন্তবিশ্ব শর্মাকে ভেতর থেকে ভালোই চেনেন কমলাক্ষ। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মাকে যত দিন কংগ্রেস নেতা হিসেবে রাজনৈতিক সমালোচনা করেছেন কমলাক্ষ, তত দিন কোনও সমস্যা হয়নি।কিন্তু, পরে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সম্পত্তি নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেন; তেমনি রিনিকি ভূঁইয়া শর্মাকেও বেলাগাম আক্রমণ করেন। সেখানেই ক্ষান্ত থাকেননি,তাঁদের তনয়-তনয়া নন্দিলবিশ্ব ও সুকন্যা এত কম বয়সে কী ভাবে অর্থপ্রাচুর্যের ‌অ‌ধিকারী হলেন, এ ব্যাপারে বাক্যবাণ প্রয়োগ করেন বার বার। নন্দিলবিশ্ব ও সুকন্যাকে নিয়ে ‘অনুগত‌’ কমলাক্ষের এ ধরনের আক্রমণ হিমন্তবিশ্ব শর্মা কোনও অবস্থায় মেনে নিতে পারেননি। এ রকম ‘সংবেদনশীল ‘বিষয় হিমন্তবিশ্ব শর্মা সহজে ভুলে যাবেন, এমনটা মনে করেন না মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, পুত্র-কন্যার ‌কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রীকে যে ‘প্রত্যাহ্বান ‘জানিয়েছিলেন কমলাক্ষ, কোনও প্রলেপে সেই ক্ষত ‘নিরাময়’ ‌হওয়া কঠিন।

কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের এক সময়কার জনপ্রিয়তা আর নেই ,সেটা একেবারে তলানিতে; এমন কথা সর্বত্র শোনা যাচ্ছে।কাটিগড়ায় তিনি দৌড়ঝাঁপ করছেন; কিন্ত, স্থানীয় কোনও বিজেপি নেতা তাঁর সঙ্গে নেই। কমলাক্ষকে নিয়ে কাটিগড়ায় এখন এমন কথাও চালু যে, “গায়ে মানে না আপনি মোড়ল।” তিন বারের বিধায়কের ‌এই দশা এখন!। এ দিকে জানা ‌‌‌‌গিয়েছে, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থকে দলে নিতে ‌‌‌‌‌আগ্রহী নন রাজ্য বিজেপি সভাপতি, সাংসদ দিলীপ শইকিয়া।কাটিগড়ার বিভিন্ন স্তরের সাংগঠনিক কমিটিগুলোও কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থকে কোনও অবস্থায় মেনে নেবেন না, এই বার্তা ‌ইতিমধ্যে প্রদান করা হয়েছে।

সমূহ ঘটনাপ্রবাহ যে দিকে মোড় নিয়েছে, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের রাজনৈতিক ‌ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘূর্ণায়মান, এর আভাস স্পষ্টতই পরিলক্ষিত।

[প্রতিবেদনের ছবি: পথপ্রদর্শক অসমের প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম রায়ের সঙ্গে বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ।] ছবি সৌজন্য : ফেসবুক

Shankar Dey

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *