শাসন ‌‌‌ক্ষমতায় ‌আরোহণ : দল বড়, না, ব্যক্তি বড় ? ভোগসর্বস্ব রাজনীতির চাপে কি পিষ্ট ‘ভিন্ন মূল্যবোধের রাজনীতি ? ‌‌’সরকারি অর্থে কাজ,তবু ফলকে ব্যক্তি প্রচারের দামামা! সিংহাসনের মহিমা : বরাকে বিজেপি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ, ভাবাচ্ছে নিষ্ঠাবান কর্মী – সমর্থকদের

নবীন বিজেপি বনাম প্রবীণ বিজেপি!অসমে এক নাগাড়ে দু’বারের ক্ষমতার বলয়,না ; আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতি? শাসকের রাজদণ্ড কি কোনও কোনও ক্ষেত্রে দলকে বিপথগামী করছে ? বরাক উপত্যকায় বিজেপির অবস্থান নিয়ে এই ‌আলোকপাত। 

অসমে বিজেপি – র জয়যাত্রা সূচিত হয়েছিল কাছাড় থেকে ।১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জনতা পার্টি – র প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই সেই অবিভক্ত কাছাড় জেলায় এই দলের প্রতি আমজনতার একটা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।এর পর এই পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে বিজেপি এখানে বিভিন্ন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চললেও ভোটের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।একেবারে শুরু থেকে যাঁরা বিজেপি বা এর শাখা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন , তাঁদের অনেকেই এখনও নানা ভাবে সক্রিয় রয়েছেন।আবার অনেকেরই জীবনদীপ নির্বাপিত হয়ে গিয়েছে।কংগ্রেস যখন ক্ষমতার তুঙ্গে ,এ অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল , তখন বিজেপি – র হয়ে বিরোধী দলের রাজনীতি করাটা এত সহজ ছিল না।কিন্তু ,বরাক উপত্যকায় পূর্ববঙ্গের ছিন্নমূল মানুষ বা তাঁদের উত্তর প্রজন্মের একাংশের কাছে বিজেপি যথেষ্ট ভরসার স্থল হয়ে দাঁড়ায়।’পার্টি উইথ অ্যা ডিফারেন্স’ অর্থাৎ ‘একটি ভিন্ন মূল্যবোধের দল ‘ হিসেবে বিজেপি – র যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা ঘোষণা করা হয়েছিল, কিছু মানুষ তাতেও আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

বিজেপিকে সমর্থন দেওয়া বরাক উপত্যকার বাঙালিদের  কাছে এত সহজ ব্যাপার ছিল না।কারণ , পশ্চিমবঙ্গ ,পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্যের বঙ্গজীবন বিজেপি – র বিপরীত মেরুতে থাকা কমিউনিস্ট ভাবধারাকে পুষ্ঠ করেই শাসন ক্ষমতায় এনেছিলেন। এমনকী ,ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ছিন্নমূল বাঙালিরাও বিজেপিকে সমর্থন করার মতো অবস্থানে ছিলেন না।ওই সময় সন্ধিক্ষণে বরাক উপত্যকায় যাঁরা বিজেপি – র পতাকা বহন করেছিলেন ,দলের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল।ক্ষমতার রাজনীতিকে প্রত্যাহ্বান জানানোর মতো মানসিকতা ছিল তাঁদের। কিন্তু ,এই দশ-এগারো বছরে বলা যায়,  উল্টে-পাল্টে গিয়েছে হিসেবের খাতাটি।দিল্লির রাজ্যপাটে এগারো বছর ধরে শাসনাধিষ্ঠ বিজেপি ।দশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে দিসপুরের ক্ষমতায় ।ভিন্ন মূল্যবোধের দল হিসেবে বিজেপি কি পারছে শাসনক্ষমতার ব্যতিক্রমী আস্বাদন জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে? এই প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বরাক উপত্যকায় এখন ছয় জন বিজেপি বিধায়ক ।কাছাড়ে চার, করিমগঞ্জে দুই, হাইলাকান্দিতে নেই।পক্ষান্তরে ,বরাকে এআইইউডিএফ পাঁচ ,কংগ্রেস চারটে কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিল।অথচ ,১৯৯১-য়ে বরাকে তিন জেলায় নয়টি বিধানসভা কেন্দ্রে বাজিমাত করে এখানে ঐতিহাসিক জয়ের সূচনা করেছিল বিজেপি। শিলচরে সমরেন্দ্রনাথ সেন ,কাটিগড়ায় কালীরঞ্জন দেব ,সোনাইয়ে বদ্রীনারায়ণ সিং ,ধলাইয়ে পরিমল শুক্লবৈদ্য ,উত্তর করিমগঞ্জে মিশনরঞ্জন দাস ,দক্ষিণ করিমগঞ্জে প্রণবকুমার নাথ ,পাথারকান্দিতে মধুসূদন তিওয়ারি ,রাতাবাড়িতে রামপ্যারী রবিদাস।ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় জয়ী হয়েছিলেন শুধু একজন ।‌ধুবড়িতে ধ্রুবকুমার সেন ।শিলচর লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন কবীন্দ্র পুরকায়স্থ ,করিমগঞ্জে দ্বারকানাথ দাস। তখন যাঁরা বিধায়ক ,সাংসদ হয়েছিলেন , তাঁদের জীবনচর্যা বিজেপির সুনামকে ক্ষুন্ন হতে দেয়নি। তখনকার শাসক কংগ্রেসের বহু নেতাই আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলেন। তৎকালীন বিজেপি বিধায়কদের কাছে যথেষ্ট প্রলোভনের মওকা এলেও তাতে তাঁরা প্রভাবিত হননি ।বিজেপি নেতাদের এই ভূমিকা জনমনে আশার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিল।১৯৯৬-য়ে বরাকে চারটে বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিল বিজেপি ।কাটিগড়ায় কালীরঞ্জন দেব ,শিলচরে বিমলাংশু রায় ,পাথারকান্দিতে সুখেন্দুশেখর দত্ত ,রাতাবাড়িতে শম্ভুসিং মালা।তখন অসমে বিজেপি সংখ্যা ছিল ‌‌‌চার।অর্থাৎ,ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বিজেপি কোনও আসনেই জয়লাভ করতে পারেনি ।লোকসভায় শিলচর আসনে কবীন্দ্র পুরকায়স্থ হেরে গেলেও করিমগঞ্জে জয়ী হয়েছিলেন দ্বারকানাথ দাস। কিন্তু , দ্বারকানাথ দাস প্রয়াত হওয়ার পর  ১৯৯৮-য়ে বিজেপি প্রার্থী পরিমল শুক্লবৈদ্যকে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন কংগ্রেসের নেপালচন্দ্র দাস।১৯৯৮-য়ে লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ‘ডাকসাইটে’ নেতা সন্তোষমোহন দেবকে হারিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জয় পেয়েছিলেন কবীন্দ্র পুরকায়স্থ।ওই সময় কেন্দ্রে অটলবিহারি বাজপেয়ী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন তিনি।১৯৯৯-য়ের লোকসভা নির্বাচনে কবীন্দ্র পুরকায়স্থ লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন সন্তোষমোহন দেবের কাছে । অন্য দিকে ,২০০০-য়ে উপ-নির্বাচনে উত্তর করিমগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে জয়লাভ করেছিলেন মিশনরঞ্জন দাস।২০০১-য়ে বরাকে যাঁরা বিজেপি বিধায়ক হয়েছিলেন ,তাঁরা হলেন শিলচরে বিমলাংশু রায় ,কাটিগড়ায় কালীরঞ্জন দেব ,ধলাইয়ে পরিমল শুক্লবৈদ্য ,উত্তর করিমগঞ্জে মিশনরঞ্জন দাস ।অসমে সব মিলিয়ে তখন আ‌ট বিজেপি বিধায়ক। ২০০৬-য়ে বরাকে জয়ী বিধায়করা ছিলেন ধলাইয়ে পরিমল শুক্লবৈদ্য ,বড়খলায় রুমি নাথ,উত্তর করিমগঞ্জে মিশনরঞ্জন দাস ,রাতাবাড়িতে শম্ভুসিং মালা।ওই নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যে দশ আসনে জয়ী হয়েছিল।এই প্রথম এক অংক থেকে দুই অংকে পৌঁছে ।

২০০৯-য়ের লোকসভা নির্বাচনে কেন্দ্রীয় কেবিনেট মন্ত্রী, প্রভাবশালী নেতা সন্তোষমোহন দেবকে পরাজিত করে ‌ফের মর্যাদাপূর্ণ জয় পান কবীন্দ্র পুরকায়স্থ ।কিন্তু ,তাৎপর্যপূর্ণভাবে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে বরাকে পনেরোটি বিধানসভা কেন্দ্রের একটিতেও জয়ী হতে পারেননি  বিজেপি প্রার্থীরা।রাজ্যে বিজেপির বিধানসভা আসন কমে হয়েছিল পাঁচ ।ওই নির্বাচনে কংগ্রেস ভালো ফল করেছিল ।কংগ্রেস পেয়েছিল ৭৮ আসন এবং তাদের জোটসঙ্গী বিপিএ‌ফ লাভ করেছিল ১২ আসন ।দু’‌দল মিলিয়ে ৯০ আসন।২০১৪ খ্রিস্টাব্দে লোকসভা নির্বাচনে বিধায়ক সুস্মিতা দেব জয়লাভ করায় শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রে উপ-নির্বাচন হয়েছিল ।‌ওই উপ-নির্বাচনে  জয়ী হয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী দিলীপকুমার পাল। ২০১১ – য়ের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভালো ফল নেতৃত্বকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী এবং দাম্ভিক করে তুলেছিল ।এক দিকে, চরম দলীয় কোন্দল ; অন্য দিকে, একাংশ নেতার দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা কংগ্রেসকে যে একেবারে খাদের মুখে ঠেলে দিয়েছে, সেটা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ মোটেই টের পাননি।আর এই সূত্র ধরেই ২০১৬-য়ের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পাঁচের জায়গায় ৬০ আসন এবং তাদের জোটসঙ্গী অসম গণ পরিষদ ‌‌১৪ কেন্দ্রে জয়ী হয়ে শাসন ক্ষমতায় আরোহন করে । ২০২১-য়ের নির্বাচনেও বজায় থাকে একই ধারা।বিজেপির প্রাপ্তি ৬০ আসন, জোটসঙ্গী অগপ ৯,ইউপিপিএল ৬।

১৯৯১ থেকে ২০১১, বরাক তথা অসমে বিজেপি রাজনীতির একটা অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।বিধানসভা ও সংসদে দলীয় প্রতিনিধিত্ব বিজেপি সংগঠনকে যথেষ্ট উর্বর করে তুলে।আর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ‌‌‌১৯৯০, এই এক দশকে বরাকে বিজেপি প্রতিষ্ঠা পর্বের যে অধ্যায়, সেটা ছিল অনেক কন্টকাকীর্ণ।২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে  শাসন ক্ষমতায় আরোহনের মধ্য দিয়ে অসমে বিজেপিতে নতুন ধারার সূচনা হয় ।এই  নয় বছরে শাসক এবং বিরোধী আসন , সিংহাসনের ‌‌‌প্রভাব ‌প্রকট ‌হচ্ছে ক্রমশ।এই বিচার-বিশ্লেষণ এই কারণে হচ্ছে যে, বিজেপির ত্যাগের রাজনীতি কি এখন অন্তর্হিত ।‌‌‌‌‌‌ভোগসর্বস্ব রাজনীতির চাপে কি পিষ্ট ‌‌‌”ভিন্ন মূল্যবোধের রাজনৈতিক দলটি?” বিভিন্ন মহলে গভীরভাবে উত্থাপিত হচ্ছে এই প্রশ্ন ।২০১৬ – র বি‌‌‌ধানসভা নির্বাচনের প্রাকপর্বে অসমে বিজেপি-র নেতৃত্বে এবং সাংগঠনিক পরিকাঠামোয় আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়।পাঁচমিশালী  বিক্রিয়ায় ওলটপালট হয়ে যায় বিজেপি – রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ।কংগ্রেস, অসম গণ পরিষদ-এর তাবড় নেতৃবৃন্দের আগমনে ‌‌‌বিজেপিতে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়, তাতে ক্ষমতার আস্বাদন মিললেও ঠিক সে ভাবে প্রাণের সংযোগ ঘটছে না দলের আগেকার মূলস্রোতের নেতা – কর্মীদের ।‌‌অত্যন্ত জাঁকজমক করে সরকার তথা দলের বড় মাপের অনুষ্ঠান হচ্ছে নিয়মিত ।কর্পোরেট আদলে পরিচালিত হচ্ছে সব কিছু ।এত ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানের অর্থ কোথা থেকে আসে, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের। বিশেষত, বরাকে বিজেপি-র ‌‌অন্দরমহলে কান পাতলেই কোনও কোনও প্রবীণ নেতা-কর্মীদের মুখে এই কথাটুকু শোনা যায় যে, ‘এ কোন পরিস্থিতির দিক এ‌গিয়ে চলে‌‌‌‌ছি?’ ‌‌‌‌‌‌অবশ্য,পাশাপাশি এই অভিমত‌ও উঠে আসছে যে ,অন্তত দলটা তো ক্ষমতায় রয়েছে ।এটাই  তাঁদের কাছে ‘সান্ত্বনা।’ 

অসমে বিজেপি মিত্রজোট সরকারে ‌প্রথম পাঁচ বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অগপ থেকে আগত সর্বানন্দ সনোয়াল।আর এই পাঁচ বছর তো মুখ্যমন্ত্রীর সিংহাসনে বসে দাপিয়ে ‌রাজ্য শাসন করছেন ‌কংগ্রেসের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ‌হিসেবে পরিচিত হিমন্তবিশ্ব শর্মা ।কংগ্রেস সরকারে মন্ত্রীপদে আসীন থাকাকালীন হিমন্তবিশ্ব শর্মা পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন ।তিনি তেইশ বছর কংগ্রেসে ছিলেন ।এর মধ্যে তরু‌‌‌ণ গগৈ সরকারে তু‌খোড় মন্ত্রী ছিলেন তেরো বছরের মতো ।সর্বানন্দ সনোয়াল বা হিমন্তবিশ্ব শর্মা  সরকারে আর যাঁরা নেতৃত্বে রয়েছেন, তাঁদের ‌অ‌‌ধিকাং‌‌শ‌ই বিজেপি বা অগপ-র ‌এক সময়কার দ্বিতীয়, তৃতীয় সারির নেতা ।বহু দিন ধরে যুক্ত বিজেপি নেতা – কর্মীদের ভিন্ন দল থেকে আসা এ সব নব্য – বিজেপিদের দাপট বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিতে হচ্ছে ।এ ছাড়া তাঁদের ‌‌কী-ই বা করার আছে ? ২০১১-‌য়ের বিধানসভা নির্বাচনে অসমে যেখানে সাকুল্যে বিজেপির পাঁচ বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন ,সেখানে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে দল শাসন ক্ষমতায় আসবে,এটা অনেকেরই চিন্তা ভাবনার বাইরে ছিল।তাই অনেকটা ‌‌‌‌‌‌‌’পড়ে পাওয়া’‌শাসন ক্ষমতার জন্য পুলকিত না হওয়ার কোনও কারণ ছিল না তাঁদের ।কিন্ত, যত দিন যাচ্ছে, বরাকে নিষ্ঠাবান বিজেপি কর্মী ‌-সমর্থকদের যেন মোহভঙ্গ ঘটছে।নানা ভাবে হতাশা গ্রাস করছে তাঁদের।চোখের সামনে তাঁরা দেখছেন, দলের একাংশের জীবনযাত্রা কী ভাবে রাতারাতি পাল্টে গিয়েছে ।প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি ।’‌‌আলাদীনের প্রদীপ’ – এর মতো কোথা থেকে এত অর্থ আসে, তা ঠাহর করা অনেকের কাছে দু:সাধ্য।অন্য দিকে ,জনগণের করের টাকায় যে সরকারি তহবিল; তা থেকে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজকর্ম করা হয় ।অথচ, সেখানেও ব্যক্তি প্রচারের দামামা বি‌‌‌ধায়ক – ‌সাংসদদের।দেশের অনেক রাজ্যে এ ধরনের সরকারি কাজের ফলকে বিধায়ক – সাংসদের নাম থাকে না।কাজের বর্ণনা ,আর্থিক বরাদ্দ, বর্ষ, উল্লেখ থাকে এ সবের ।কিন্তু ,এখানে কংগ্রেস আমলের মতোই জাহির করার প্রতিযোগিতা চলছে ।

এ ‌কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বরাকে বিজেপির রাশ এখন যুব নেতৃত্বের হাতে ।রাজ্যে বরাক থেকে দুই মন্ত্রী।কাছাড় থেকে কৌশিক রায়, শ্রীভূমি থেকে কৃষ্ণেন্দু পাল।কৌশিক রায় ‌এখন অবধি আগাগোড়াই বিজেপিতে। ‌কৃষ্ণেন্দু পাল কংগ্রেস থেকে আগত বিজেপিতে ।শুধু মন্ত্রিত্ব পদের নিরিখেই নয় ,এর অনেক আগে থেকেই দু’জনই ‘করিৎকর্মা ‘হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত ।কৌশিক রায় ছাড়াও কাছাড়ে এখন যাঁরা বিজেপি বিধায়ক, মিহিরকান্তি সোম, দীপায়ন চক্রবর্তী ,নীহাররঞ্জন দাস ; তাঁরা দল করছেন দীর্ঘ দিন ধরে।এর মধ্যে মিহিরকান্তি সোম লাগাতার দু’ বার বিধায়ক ।দলের প্রবীণ নেতা পরিমল শুক্লবৈদ্য শিলচর তফসিলি সংরক্ষিত লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ ।রাজ্যসভা সাংসদ হয়েছেন দলের পোড়খাওয়া নেতা কণাদ পুরকায়স্থ ।সেই দিক থেকে দেখতে গেলে কাছাড়ে বিজেপির কর্তৃত্ব কংগ্রেসের নবাগতদের হাতে তেমন নেই ।দেখা যাচ্ছে, দু-‌‌চার জন নব্য বিজেপি ২০২৬ – ‌‌য়ের বিধানসভা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ করলেও তাঁরা এখনও তেমন ধর্তব্যের মধ্যে নন।শ্রীভূমির চিত্রটা অন্য রকম ।সেখানকার লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ কৃপানাথ মালা আগে ছিলেন কংগ্রেসে।রাজ্যের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল তো দীর্ঘদিন কংগ্রেস সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন ।কৃপানাথ ,কৃষ্ণেন্দু দু’জনই হিমন্তবিশ্ব শর্মা শিবিরের ।তাঁদের মতো আরও যাঁরা রয়েছেন ,তাঁদের কাছে দল গৌণ ,হিমন্তবিশ্ব শর্মা মুখ্য ।এই রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রাজ্যে এক নাগাড়ে দু’ বারের বিজেপি ‌‌শাসন কাল নিয়ে চর্চার পরিসর ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে।বিধানসভা নির্বাচন যখন দোরগোড়ায় ,তখন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির রাজনৈতিক আবহ সর‌গরম ‌হবে ,এটাই স্বাভাবিক ।

এটা আলোচিত হচ্ছে যে ,রাজ্যের বর্তমান সরকারের প্রতিনিধিরা জনগণের সামনে এমন কোনও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি, যা কংগ্রেস শাসনের সঙ্গে পার্থক্য সূচিত করে ।বরং দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেস আমলে যে সব দুর্নীতির সঙ্গে আপস করা হতো, সেই ধারা এখনও বহমান ।দেশে-বিদেশে বিভিন্ন দ্রব্যাদির ‌অবৈধ পাচারে বহু চর্চিত ‘সিন্ডিকেটরাজ‌’ চলছে জোরকদমে ।সুপারি থেকে কয়লা ; বাদ যাচ্ছে না কোন‌‌‌‌‌‌‌ও লাভের অংকই ।কোনও কোনও ক্ষেত্রে হাত বদল হয়েছে শুধু ।আবার ,রাজনীতি ও ঠিকাদারি সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ায় কোনও কোনও ক্ষেত্রে উন্নয়নের দফারফা অবস্থা।একাংশ বিজেপি কর্মী – সমর্থকদের কাছে এটা আশ্চর্যজনক ঠেকছে যে,দলের সামগ্রিক চিন্তা-ভাবনা বিসর্জন দিয়ে কী ভাবে কিছু নেতা ব্যক্তিস্বার্থ পূরণে “হয়কে নয় এবং নয়কে হয়” করছেন ।আত্মকেন্দ্রিক প্রচার তাঁদের কাছে মুখ্য ‌হয়ে দাঁড়িয়েছে ।কংগ্রেসের আগেকার প্রভাবশালী কিছু নেতার মতো বরাকের কোনও কোনও বিজেপি নেতাকে ঘিরে ‘ব্যক্তিপূজা’ হচ্ছে । কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে বিজেপি তথা মিত্রজোট সরকারকে ‌‌প্রতিষ্ঠিত করতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা দৃঢ়ভাবে বিভিন্ন যুক্তির অবতারণা ‌করে থাকেন।কিন্তু, বরাকের প্রেক্ষাপটে বহু ক্ষেত্রেই তা বাস্তবতা বিসর্জিত বলে বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহল মনে করেন।তা’হলে কি যুব নেতৃত্বের হাত ধরে বিজেপি বরাক উপত্যকায় সঠিক দিশায় এগোচ্ছে না? সর্বানন্দ সনোয়ালের নেতৃত্বে প্রথম পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পর হিমন্তবিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন এই পাঁচ বছরের শেষ লগ্নে দলকে ‌ঘিরে এ ভাবেই তাক করে আছে অনেক প্রশ্ন ।দুই মন্ত্রী কৌশিক রায় এবং কৃষ্ণেন্দু পাল-ই এখন বরাকে সর্বেসর্বা ।বিধায়কদের মধ্যেও কেউ কেউ খুবই ‘করিৎকর্মা ।’

এই অঞ্চলের উন্নয়নের  বিষয়টি দূরে সরিয়ে রেখেও যে মোক্ষম প্রশ্ন উঠে আসছে; তা ‌হলো,‌এই নেতৃত্বের হাতে দলের ভাবমূর্তি ‌আখেরে কতটুকু সুরক্ষিত?

Shankar Dey

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *